সোমবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২২

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত

spot_img
Homeশিক্ষাউল্টো পথে কারিগরি শিক্ষা

উল্টো পথে কারিগরি শিক্ষা

কারিগরি শিক্ষায় জোর দেয়ার কথা বলা হলেও পরিস্থিতি ঠিক যেন উল্টো দিকে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৮ শতাংশ আসনই থাকছে খালি। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানে এসব আসন খালি থাকলেও নতুন করে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ১০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি ৫৬৪টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার। চলতি বছরে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৮১ হাজার শিক্ষার্থী। এই হিসাবে কারিগরিতে মাত্র ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের চাহিদা থাকলেও একেবারেই মুখ ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে বেসরকারিগুলো থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন আগে জরুরি। এখানে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া দরকার।প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার স্থাপন দরকার। এগুলো করা হলে দেশ বেশি উপকৃত হবে। পাশাপাশি নতুন প্রতিষ্ঠান হতে পারে। তবে মান উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের সিভিল বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান বলেন, আমরা দেশসেরা পলিটেকনিক্যালে পড়ছি এরপরও মেলে না পর্যাপ্ত ব্যবহারিকের সুযোগ। যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আসেন। আমাদেরকে তাদের সহযোগী হিসেবে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে হয়। আমাদেরকে কর্মক্ষেত্রে শুরুতেই পলিটেকনিকের শিক্ষার্থী হিসেবে পিছিয়ে যেতে হয়।

 

তিনি বলেন, একটি কন্সট্রাকশন ফার্মে গতবছর চাকরির জন্য যাই। আমার অভিজ্ঞতা ছিল আড়াই বছরের। আবার আমার প্রতিযোগী হিসেবে ছিল সদ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীরা। ভাইভাতে সব ধরনের প্রশ্নের জবাব দিলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও আমার চাকরি হলো না। বর্তমানে সরকারি পলিটেকনিক আছে ৪৯টি। যাতে আসন সংখ্যা ৪৩ হাজার ৪শ’। চলতি বছরে ভর্তি হয়েছেন ৪১ হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ঢের কম।

 

দেশের রেজিস্টার্ড ৫১৫টি বেসরকারি কারিগরিতে আসন তিন লাখ ২৫ হাজার। বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৪০ হাজার শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী টানতে সরকারিতে এসএসসিতে ন্যূনতম স্কোর রাখা হয় ২.৫। আর বেসরকারিতে জিপিএ- ২। বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা করুণ। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও কাজের সুযোগ মেলে এই বিষয়ে অধ্যয়নের মাধ্যমে। বগুড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোত্তাসিম ফাইয়াজ বলেন, আমাদের শুধুমাত্র বিষয়টাই খোলা হলো।

 

প্রতিষ্ঠান সিলেবাস ঠিক করতে করতেই চলে যায় এক বছর। আমরা প্রথম তিন বছরে পাইনি এই বিষয়ের কোনো শিক্ষক। অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকরা বই দেখে যতোটুকু পেরেছেন শুধুমাত্র আমাদের পার করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এরপর আমরা যখন চাকরি বাজারে যাই আমাদের বাস্তব-ধর্মী কোন জ্ঞানই ছিল না। আমাদের চাকরি অফার করা হয় সাধারণ এইচএসসি পাস ক্যাটাগরিতে।

 

শিক্ষার্থীরা বলছেন, সরকারি কারিগরিতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহী শুধুমাত্র বিনামূল্যে ভর্তি হতে পাচ্ছেন এজন্য। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আর কোনো কাজেই আসবে না এসব প্রতিষ্ঠান। তবে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর সুখ্যাতি আছে বেশ। দিনাজপুর টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যবহারিক ক্লাসের সুবিধা আছে। তবে এটা পর্যাপ্ত না। আর সেই সাথে আধুনিকায়ন প্রয়োজন। আবার বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক’র সাবেক শিক্ষার্থী আলেয়া আমেরিনও বলেন, আমরা একটি নির্দিষ্ট সেক্টরের শিক্ষার্থী। কিন্তু আমরা চাকরির বাজারে এগিয়ে থাকার কথা কিন্তু তা হচ্ছে না।আমাদের থেকে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা বেশি এগিয়ে থাকছেন। এর কারণ আমাদের শুধু সার্টিফিকেটে বিশেষত্ব আছে। আমরা বাস্তবতা সম্পন্ন কোনো জ্ঞানার্জন করতে পারছি না। কারিগরিতে নানা প্রতিবন্ধকাতার পাশাপাশি আছে ভয়াবহ শিক্ষক সংকট। ২০৫০ সালে কারিগরি শিক্ষাকে মূল ধারায় আনতে চায় সরকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। গতি ধীর হলেও পরিবর্তন আসছে কোর্স-কারিকুলামে।

 

কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠাগুলোতেও রয়েছে ভয়াবহ শিক্ষক সংকট।আছে ল্যাব সংকট। বর্তমানে ট্রেড ও শর্ট কোর্স মিলিয়ে অধ্যয়নরত আছেন প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী। ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩৬টি বিষয়ে। এর বাইরে বিদেশ-মুখী জনশক্তি, ব্যবসা, চাকরিতে মানোন্নয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে তিন মাস, ছয় মাস ও এক বছর মেয়াদি কোর্স চালু রয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের প্রায় দুই হাজার স্কুলে নবম-দশম শ্রেণি এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ভোকেশনাল শিক্ষা চালু আছে। উচ্চ মাধ্যমিকে আছে এইচএসসি বিএম (ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা)।

 

সবমিলে এসব কোর্স ও ট্রেডে কারিগরি শিক্ষা দেয়া হয় সারা দেশে প্রায় নয় হাজার প্রতিষ্ঠানে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য নেই শক্ত ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকার ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা না রেখেই চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নামে, খ্যাতিতে অনন্য ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট। রাজধানীর বুকে এই ইন্সটিটিউটে ভর্তির জন্য প্রতিবছরই লড়াইয়ে নাম লেখান হাজার হাজার শিক্ষার্থী। বর্তমানে এতে অধ্যয়নরত আছেন প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী।

 

যাতে শিক্ষক থাকার কথা ছিল ৩৯৪ জন। কিন্তু মাত্র ১০১ জন শিক্ষক দিয়েই চালানো হচ্ছে শিক্ষা-কার্যক্রম। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ২০ শতাংশ, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে মোট শিক্ষার্থীর ৫০ শতাংশ আনার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লক্ষণীয় কোনো উদ্যোগ নেই।

 

মানোন্নয়ন, ব্যবহারিক সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষক সংকট, মানসম্মত সিলেবাস-কোর্স, কারিগরি শিক্ষা নিয়ে প্রচারণার উদ্যোগ নেয়া না হলেও নতুন ১০০ প্রতিষ্ঠান করতে যাচ্ছে সরকার। বলা হয়- দেশের ১০০টি উপজেলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণে অবকাঠামোও স্থাপন করা হবে। চলতি বছরের ১০ই মে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একেক) সভায় সংশোধিত প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়। এই প্রকল্পের জন্য ৪৮৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুলে আগের স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নের অধিক প্রয়োজন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ournews24.com এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের পছন্দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ খবর