বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৬, ২০২২

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত

spot_img
Homeআইন-বিচারপ্রভাবশালীদের জোরে আটকে আছে দুদকের অর্থ পাচার মামলা

প্রভাবশালীদের জোরে আটকে আছে দুদকের অর্থ পাচার মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০১৪ সালের ৭ মে’র ঘটনা। ATZ Communications Pte Ltd নামের নবগঠিত একটি প্রতিষ্ঠান সিংগাপুরের The Accounting & Corporate Regulatory Authority (ACRA) থেকে রেজিস্ট্রেশন আদায় করে নেয়। যার মালিক হিসেবে উল্লেখ করা হয় সিংগাপুরের নাগরিক Mr. Chua Nam Huat Samson এর নাম।
প্রতিষ্ঠানটির ধরন হিসেবে তখন বলা হয় নবগঠিত ATZ Communications Pte Ltd মূলত টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিস প্রোভাইডার। যাদের ব্যবসার ডাল-পালা রয়েছে দেশে ও বিদেশে। তবে আর্থিক রেকর্ড ঘাটতে গিয়ে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে সিংগাপুরের নাগরিক Mr. Chua Nam Huat Samson এর নাম থাকলেও সেটির অ্যাকাউন্ট পাওয়া যায় বাংলাদেশের এক নাগরিকের নামে। জানা যায়, ATZ Communications Pte Ltd নামের প্রতিষ্ঠানটি OBU, চট্টগ্রামের একজন গ্রাহক যার চলতি হিসাব নং- ৪৬০১৭৮৯৭২৬০৪০, তারিখ: ২২/৫/২০১৪। অর্থাৎ সিংগাপুর থেকে টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে ATZ Communications Pte Ltd’কে গড়ে তুলতে আগের মাসে কোনো পরিচয়দানকারী ছাড়াই ব্যাংক হিসাবটি খোলা হয়।
কিন্তু এমন ভুয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অর্থ কি? স্পষ্ট হয় অচিরেই! ২০১৪ সালের ২০ মে অর্থাৎ সেই মাসেই কথিত প্রতিষ্ঠানটি ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের জন্য চট্টগ্রামে এবি ব্যাংক লিমিটেডের Offshore Banking Unit (OBU), Bay shopping centre, EPZ, ম্যানেজার বরাবর আবেদন করে।

এরপর প্রধান কার্যালয়ের CRM Divission এবং ক্রেডিট কমিটির সদস্য এসইভিপি জনাব সালমা আক্তার, ডিএমডি জনাব মশিউর রহমান ঋণের বিষয়ে কোনো প্রকার বিচার-বিশ্লেষণ তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ প্রস্তাবটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের জন্য পর্ষদ বরাবর পেশ করেন। পরিচালনা পর্ষদও যেন এরই অপেক্ষায় ছিলেন।
অর্থাৎ কোম্পানি গঠনের মাত্র ২০ দিনের মাথায় ১০ মিলিয়ন ডলার ঋণ আবেদন ও তা মঞ্জুর করা হয়।কিন্তু কি কারণে ATZ Communications Pte Ltd থেকে সিঙ্গাপুরের OCBC Bank এর ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ পাঠানো হলো তার কোনো যুক্তিসংগত কারণ ব্যাংক কর্তৃপক্স সরবরাহ করতে পারেনি।

প্রতিবেদনে উপরোক্ত ব্যক্তিরা যাদের আসামী উল্লেখ করে বলা হয়, ATZ Communications Pte Ltd এর নামে ঋণ প্রস্তাব প্রেরণসহ মঞ্জুরী প্রদানপূর্বক মঞ্জুরীকৃত ও বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ১.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রতি মার্কিন ডলারের ৮০ টাকা ধরে) মোট চৌদ্দ কোটি আটাশি লক্ষ টাকা বিদেশে পাচারের মাধ্যমে আত্মসাত করেছেন বলে দেখা গেছে।
এমতাবস্থায় বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে এলে সংস্থাটি তদন্তে নামে।সেখানেও এবি ব্যাংকের গঠিত তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনের সত্যতা পায় দুদক।

দীর্ঘ ৪ বছর পর সবশেষ গত ২৬ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক জেসমিন আক্তার স্বাক্ষরিত এর সবশেষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। সেখানে এই মানিলন্ডারিং কার্যে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ মোট ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।

তারা হলেন,
১.মো, লোকমান হোসেন, সাবেক হেড অব ওবিও, ইপিজেড, এবি ব্যাংক লি.
২.মো. আরিফ নেওয়াজ, এসপিও, ওবিও, ইপিজেড, এবি ব্যাংক লি.
৩.মো. সালাহ উদ্দিন, ওবিও, ইপিজেড, এবি ব্যাংক লি.
৪.পানেট চক্রবর্তী, এভিপি, এবি ব্যাংক লি.
৫.কাজী নাসিম আহমেদ, সাবেক ইভিপি, এবি ব্যাংক লি.
৬. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সাবেক এসইভিপি & হেড অব বিজনেস, এবি ব্যাংক লি.
৭. সালমা আক্তার, সাবেক এসইভিপি, ও হেড অব সিআরওম এবং সদস্য ক্রেডিট কমিটি, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
৮. মশিউর রহমান চৌধুরী, সাবেক ডিএমডি ও হেড অব ক্রেডিট কমিটি,এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
৯. এম ওয়াহিদুল হক,সাবেক চেয়ারম্যান, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১০. মো. এম এ আউয়াল, সাবেক পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১১. ফাহিম উল হক, সাবেক পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১২. ফিরোজ আহমেদ, পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১৩. সৈয়দ আফজাল হাসান উদ্দিন, সাবেক পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১৪. শিশির রঞ্জন বোস, সাবেক পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১৫. বি বি সাহা রায়, সাবেক পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১৬. মো, মেজবাউল হক, সাবেক পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১৭. জাকিয়া এস আর খান, সাবেক পরিচালক, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১৮. সাজ্জাদ হোসেন, ডিএমডি এন্ড হেড অফ অপারেশনস, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
১৯. মো. শাহজাহান, সাবেক ইভিপি এন্ড হেড অফ আইসিসিডি, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
২০. মো. আমিনুর রহমান, ইভিপি এন্ড হেড অফ আইসিসিডি, এবি ব্যাংক লি.প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
সরফুদ্দিন আহমেদ, সাবেক ইভিপি, এফআই, এবি ব্যাংক লি. প্রধান কার্যালয়, ঢাকা।

তদন্তে আরো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা মিলতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।কিন্তু প্রতিবেদন দাখিলের মাত্র ক’দিনের মাথায় দুদকের সহকারী পরিচালক জেসমিন আক্তারের কাছ থেকে নিয়ে দায়িত্বটি সংস্থাটির অপর সহকারী পরিচালক মো নজরুলের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
একই সাথে তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উক্ত প্রতিবেদনটি মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজের কাছেও পেশ করা হলেও সে কার্যক্রম থমকে গেছে বলে দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিষয়টি দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২) মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকাংশই আগাম জামিন নিয়েছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

আদালত সূত্র আরও জানিয়েছেন, মামলা থেকে রেহাই পেতে অভিযুক্তরা শুধু ডাকসাইটে আইনজীবীর স্মরণাপন্ন হয়েই থেমে থাকেননি। বিষয়টি মিমাংসা করতে দুদকসহ বিভিন্ন মহলে চেষ্টা তদবিরও তারা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অভিযুক্তদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।

আওয়ারনিউজটোয়েন্টিফোর.কম এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের পছন্দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ খবর