বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৬, ২০২২

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত

spot_img
Homeদেশজুড়েকারা ফটকে ছেলের সামনেই মা-বাবার বিয়ে

কারা ফটকে ছেলের সামনেই মা-বাবার বিয়ে

ধর্ষণ মামলায় আট বছর ধরে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি আদিবাসী দিলীপ খালকো (৩০)। ধর্ষণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিগত ২০১২ সালে নিম্ন আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের শুনানিতে দিলীপের আইনজীবী তার জামিনের আবেদন করেন। ধর্ষণের শিকার ওই নারী আদালতে শুনানির সময় উপস্থিত ছিলেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, তারা (বাদী ও আসামি) বিয়ে করবেন। আসামিকে জামিন দিলে তার আপত্তি নেই। শুনানি শেষে আদালত জামিনের শর্ত হিসেবে কারা ফটকেই তাদের বিয়ের আদেশ দেন।

জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত ডিভিশন বেঞ্চ কারাফটকে ভিকটিম ও আসামির বিয়ের আদেশ দেন। সেই আদেশের প্রেক্ষীতেই আজ শনিবার তাদের বিয়ের সম্পন্ন হয়। বিয়ের ৩০ দিনের মধ্যে বিষয়টি লিখিতভাবে অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়।

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে শনিবার ( ৫ ডিসেম্বর) বিকেলে দিলীপ খালকোর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। কয়েদি দিলীপ খালকোর বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর ভিকারপাড়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের সিতানাথ খালকোর ছেলে। তার বিয়ের জন্য এ দিন কনেসহ দুই পরিবারের অন্তত ১৪ জন মানুষ রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিলেন। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্যও। তাদের সঙ্গে এসেছিল ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া ভিকটিম নারীর আট বছরের ছেলেও।

কনেসহ দুই পরিবারের সদস্যরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্যালো ইঞ্জিন চালিত একটি নসিমনে চড়ে কারাগারের সামনের পদ্মা নদীর তীরে আসেন। এরপর দুপুরের দিকে তাদের কারা ফটকে ঢোকানো হয়। কারাগার কর্তৃপক্ষের আহবানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রার কৃষ্ণা দেবী এবং পুরহিত পরিমল চক্রবর্তী। কনে পক্ষ আসার পর কারাগার থেকে বর দিলীপ খালকোকে আনা হয়। তারপর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালার উপস্থিতিতে দুপুর সাড়ে ১২টার পর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে বিকেল হয়ে যায়। এরপর সিনিয়র জেল সুপার কনেকে একটি নতুন শাড়ি উপহার দেন। দুই পরিবারের সবাইকে মিষ্টিমুখও করানো হয়।

দিলীপ কয়েদি হিসেবে এখনও কারাবন্দী থাকার কারণে বিয়ের ছবি তোলা যায়নি। তবে দিলীপের অনুভূতি জানা গেছে। দিলীপ বলেন, ‘বিয়ে করে ভালোই লাগছে। সবাই দোয়া করবেন। যেন সুখে-শান্তিতে সংসার করতে পারি।’ কনে বলেন, ‘আমরা চাই যেন বাকি জীবনটা ভালভাবে কাটাতে পারি।’

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা বলেন, উচ্চ আদালত কারাফটকে ধর্ষণের শিকার নারীর সঙ্গে দিলীপের বিয়ে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিন দিন আগে আদালতের আদেশের কপি পাওয়ার পরই দুইপক্ষকে ডাকা হয়। সুষ্ঠুভাবে বিয়েও সম্পন্ন হলো। এখন যত দ্রুত সম্ভব তাদের বিয়ের কাগজপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হবে।

মামলা সূত্রে জানা যায়, দিলীপ কুমার এবং ভিকটিম সম্পর্কে খালাতো ভাই-বোন। তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। এর সূত্র ধরে ভিকটিমকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে ২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দৈহিক মেলামেশা করেন দিলীপ। এতে ভিকটিম গর্ভবতী হয়ে পড়েন। কিন্তু থেকে দিলীপ আর তাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে সালিশ করার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়।

শেষ পর্যন্ত সালিশ বৈঠক না হওয়ায় ভিকটিম ওই বছরের ২৩ অক্টোবর প্রেগন্যান্সি পরীক্ষা করেন। এরপর ২৫ অক্টোবর গোদাগাড়ী মডেল থানায় হাজির হয়ে দিলীপ খালকোর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় আসামির বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর বিচার শেষে ওই বছরের ১২ জুন এক রায়ে দিলীপ খালকোকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত।

যখন ভিকটিম ধর্ষণের শিকার হন তখন তার বয়স ছিল ১৪ বছর। কিন্তু সেই বয়সেই তার কোলে আসে পুত্র সন্তান। মেয়েটির আর পড়াশোনা করা হয়নি। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা আদিবাসী খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এই মেয়েটি কৃষি শ্রমিক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করে। দিনে দিনে বড় হতে থাকে তার সন্তান। তার সন্তানের বয়স এখন আট বছর। দিলীপেরও আট বছর জেল খাটা হয়ে গেছে। এতদিন পর দুই পরিবারের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। কনের সম্মতিতেই আদালত তাদের বিয়ের আদেশ দেন। এখন বিয়ের কাগজপত্র উচ্চ আদালতে গেলে জামিন পেতে পারেন দিলীপ খালকো।

আওয়ারনিউজটোয়েন্টিফোর.কম এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের পছন্দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ খবর