বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ আটকে আছে যে কারণে

6

পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায় বহুল কাঙ্ক্ষিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কোনও অগ্রগতি হচ্ছে না। একবছর আগে এই প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায় জরিপ ও ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান জানান, আগামী ৪-৫ মাসের মধ্যে পরামর্শক নিয়োগের সম্ভবনা রয়েছে। এরপর অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে আগামী দেড় বছরের মধ্যে রেলপথ নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের মধ্যে সরাসরি রেলপথ না থাকায় এ অঞ্চলের লালমনি এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য ট্রেনগুলোকে সান্তাহার জংশন, নাটোর ও পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার ঘুরে ঢাকায় যেতে হয়। প্রায় দ্বিগুণ পথ যেতে একদিকে সময় অন্যদিকে অর্থের ব্যয় হচ্ছে। ট্রেনে বগুড়া থেকে দীর্ঘপথ ঘুরে ঢাকার দূরত্ব ৪০৫ কিলোমিটার। যানজট ছাড়া বগুড়া থেকে ঢাকায় বাসে যেতে লাগে সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টা। অথচ ট্রেনে যেতে সময় ব্যয় হয় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ হলে ট্রেনে কম করে তিন ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে। এ কারণে সরকার বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা করে।

২০০৫ সালে প্রথম এই রেলপথ নির্মাণে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে জমি অধিগ্রহণের জন্য জরিপও চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, বগুড়া থেকে নির্বাচিত তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় এক প্রভাবশালী পরিবহন ব্যবসায়ীর বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি ভেস্তে যায়। ২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন। এতে এ অঞ্চলের মানুষ আশায় বুক বাঁধলেও পরবর্তীতে রেলপথ নির্মাণ তৎপরতা অজ্ঞাত কারণে থেমে যায়। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে এক  জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও রেলপথ নির্মাণের আশ্বাস দেন। তবে অর্থের সংস্থান না হওয়ায় প্রকল্পটির কার্যক্রম থমকে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকায় ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় তৃতীয় ক্রেডিট লাইনে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে ঋণ দিতে দেশটি সম্মত হয়। এর পরপরই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রজেক্ট প্রোফাইল প্রণয়ন, নকশা তৈরি, স্টেশনের সংখ্যা নির্ধারণ এবং জমির দাম নির্ধারণের কাজ করা হয়।

সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের আওতায় ডুয়েল গেজের দুটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছে। বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট বেলাইল এলাকা থেকে সিরাজগঞ্জের এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত মূল রুট ৭২ কিলোমিটার এবং বগুড়ার কাহালু স্টেশন থেকে রাণীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারসহ মোট ৮৪ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেলপথ। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে রাণীরহাটে জংশন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রুটে শেরপুর, চান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ, কৃষাণদিয়া ও সদানন্দপুরে স্টেশন স্থাপন করা হবে। প্রস্তাবিত ৮৪ কিলোমিটার রেলপথের জন্য ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়ায় ৫২ কিলোমিটার রেলপথের জন্য ৫১০ একর এবং সিরাগঞ্জের ৩২ কিলোমিটারের জন্য ৪৫০ একর। সবমিলিয়ে প্রকল্পের নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি গত ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেকের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভারতের ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবার কথা রয়েছে। শর্তানুসারে তারাই পরামর্শক নিয়োগ দেবে।

প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান বলেন, ‘আগামী ৪-৫ মাসের মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ হবে। এরপর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, সার্ভে, জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য কাজ আছে। সব প্রক্রিয়া শেষে রেলপথের মূল কাজ শুরু করতে আরও অন্তত দেড় বছর লাগতে পারে। অর্থাৎ,২০২১ সালের মাঝামাঝি বহুল কাঙ্ক্ষিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here