প্রাণের উৎসব বৈশাখ বাদশা অকবরের শাসনামল থেকে বহমান

91

খন্দকার শাহীন আফরোজ: মুঘল বাদশা আকববর এর শাসনামলে কৃষিকাজ ও কৃষকদের খাজনা প্রদানের সুবিধর্থে ভারতীয় সোলার ক্যালিন্ডার বা সৈর-পঞ্জিকার ও হিজরি লুনার ক্যালিন্ডার বা চন্দ্র পঞ্জিকার ওপর ভিত্তি করে বাদশা আকবরের নির্দেশে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফতেউল্লাহ শিরাজি বাংলা পঞ্জিকা প্রনয়ণ করেন। যেটা বঙ্গাব্ধ বা বাংলা অধিবর্ষ হিসাবে পরিচিতি পায়। পহেলা বৈশাখের উদযাপন আকবরের আমল থেকেই শুরু হয়।

আকবরের শাসনামলে চৈত্রমাসের শেষ দিনে কৃষকেরা তাদের সমস্ত লেনদেন ভূস্বামীদের বুঝিয়ে দিতেন। সেই সাথে বৈশাখের প্রথম দিনে কৃষকদের তাদের ভূস্বামীরা মিষ্টিমুখ করাতেন। এই দিনে গুরুত্বপূর্ণ স্তানগুলোতে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতির ধারা-বাহিকতা নিয়ে বসতো মেলা।  ফলশ্রুতিতে দিনটি বাঙালীদের পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিনত হতো। এই দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো হালখাতা বা হিসাবের নতুন খাতা প্রস্তুতকরণ। যা অধ্যাবধি এদেশের ব্যাক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত রয়েছে।

আমাদের সংস্কৃতির অতি প্রাচীন অনুষ্ঠান মালা গুলোর মধ্যে অন্যতম সেই আদিকাল থেকে এখনো অন্যতম পহেলা বৈশাখ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালীদের অতি প্রাণের উৎসব এই পহেলা বৈশাখ।

তৎকালনি পাক-শাসনামলে পূর্ব বাংলাকে মুসলমানদের ভূখন্ড বিবেচনা করে এবং পহেলা বৈশাখকে প্রকৃতি পুজাঁ বা হিন্দুদের আচার হিসাবে প্রচার করে পাক-সরকার কৌশলে বাঙালীদের সংস্কৃতিহীন করার যে অপচেস্টা আটে তাতে অনেক বাঙালী মুসলমান বিভ্রান্তে পড়ে যায় এবং যার একটা রেশ এখনো গোড়াঁ মুসলমান বাঙালীদের মধ্যে লক্ষ্যনীয়।

এক তথ্যে জানা যায় পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে ভাষা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভাষা অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে পূর্ব বাংলায় বাঙালীরা তাদের সংস্কৃতি সর্ম্পকে নতুন করে ভাবতে শুরু করে বা সচেতন হয়। ১৯৭১’র স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালী ফিরে পায়। ৭১’র এ একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডের পাশাপাশি মানচিত্র লাল সবুজের পতাকা আমরা পাই, আমাদের সংস্কৃতির স্বাধীনতা। বলা যায় দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতা পাই বলেই আমরা আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে খুব সজাগ হয়ে উঠি। তারই ফলশ্রুতিতে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে হিন্দু-মুসলিম সকল ধর্মের  মানুষের প্রাণের উৎসব। বাঙালীর জাতীয় জীবনে ও বৈশাখ নি:সন্দেহে বড় অনুষ্ঠান তো বটেই। সমগ্র বৈশাখ মাস হয়ে ওঠে বাঙালীর আপন সংস্কৃতির সাধনা ও প্রেরণার মাস।

পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আমাদের অনেক পুরনো সংস্কৃতি জড়িয়ে ছিল, যেমন–যাত্রা, পালা গান, কবি গান, গাজির গান, অলকাপ গান, পুতুল নাচ, বাউল-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি গান, বর্ণনামূলক নাটক, যেমন–লাইলি-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ, ইউসুফ-জুলেখার মঞ্চস্থ, ইত্যাদি যা এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। যদিও পুতুল নাচ ও যাত্রা এখনো কোথাও কোথাও দেখানো হয় তবে তা বিকৃত অবস্থায়। একসময় ঢাকায় ঘুড়ি উড্ডয়ন, মুন্সীগঞ্জে ষাঁড়ের দৌড় প্রতিযোগিতা এবং গ্রামাঞ্চলে ঘোড়-দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের যুদ্ধ, নৌকা বাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল যা এখন প্রায় আমাদের বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তবে এখনো পহেলা বৈশাখে চট্টগ্রামে বলি ও রাজশাহীতে গম্ভীরা বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এছাড়াও আগামীকাল বর্ষবরণের আগের দিন শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় চারুকলা বিভাগের আয়োজনে নতুন কলাভবনের সামনে মহুয়াতলায় অনুষ্ঠিত হবে বর্ষ বিদায়ের অনুষ্ঠান চৈত্র সংক্রান্তি। এতে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে থাকবে নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি। আর মূল আকর্ষণ থাকবে ব্যাঙের বিয়ে। মুক্তমঞ্চ প্রাঙ্গণে দুই দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলা চলাকালে সংগীত, নৃত্য ও নাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রয়েছে।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন এখন বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। প্রতিটি বাঙালি এই দিনটিকে উদযাপন করে উৎসবের আমেজে। নতুন পোশাক পরে সবাই মিলিত হন সাংস্কৃতিক আয়োজনে। ছায়ানট রমনার বটমূলে বর্ষ বরণের যে প্রভাতী অনুষ্ঠান শুরু করেছিল তা আজ বিশ্বজুড়ে বর্ষ বরণের প্রতীক হয়ে উঠেছে।তথ্য বিভিন্ন র্জানাল থেকে সংগৃহীত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here