পুড়ল সবই, পুড়েনি আল্লাহ নাম “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’!

109

খন্দকার শাহীন আফরোজ ঃ রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিয়েছে প্রিয়জন,কেড়েনিয়েছে জীবনে তিলতিল করে অর্জিত ধন-সম্পদ, পথোচারীর প্রাণ । আগুনে অঙ্গার’ হয়েছে ‘ আহত হয়েছেন কতজনা। হাসপাতালে কাতরাচ্ছে দগ্ধ যন্ত্রণায় কতজন। প্রিয়জন এখনো ঘরে ফিরেনি ,তাই হাসপাতাল থেকে হাসপাতালের মর্গে খোঁজে ফিরছে আপনজনের সন্ধানে কতজন! চোখের জলে ভাসছে বুক আসবে এই তার প্রিয়জন ডাকবে পিছন ফিরেই দেখবে ভাই,সন্তান ,বাপের মুখ এখনো আশায় বেধেঁ আছে বুক ।কিন্ত ফিরছে না ,কি কষ্ট চকবাজারের আগুন !

এতো কিছু পুড়ে দগ্ধ হলেও পুরেনি আল্লাহ নাম  “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ !

এই আগুনে পুড়ে ছারখার চকবাজারে চুড়িহাট্টার একাধিক ভবন। ওয়াহেদ ম্যানশনের আশপাশের ভবনগুলোও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।চুড়িহাট্টা মোড়ের বাঁ দিককার রাজমনি হোটেলটিও পুড়ে গেছে। পুড়ে গেছে দোকানের আসবাব থেকে শুরু করে সাটারও। সামনের সাইনবোর্ডটাও অবশিষ্ট নেই। ভবন প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু অংশ পড়েও গেছে।

তবে হোটেলে প্রবেশদ্বারে সাদা টাইলস খোদাই করে লেখা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (স.)’ অংশটুকু পুড়েনি। অবিকল অবস্থায় আছে। আরবি ও বাংলা ভাষায় লেখা মুসলমানদের পবিত্র কালিমায়ে তাইয়্যেবা অক্ষত দেখে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। এটি অনেকের দৃষ্টিগোচরও হচ্ছে। সব শেষ করে দিয়েছে আগুন,কিন্ত আল্লাহ নাম কেড়ে বা মুছে দিতে পারেনি!

যা সকল ধর্মের মানুষের মুখে মুখে এখন পুরান ঢাকার চকবাজারে, অনেক ধর্মানুরাগীর মধ্যে এটি কৌতূহল সৃষ্টি করছে। জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অবাক হয়ে দেখছে। সকল ধর্মের  মানুষেরা আগুনে ধ্বংস হয়ে যাওয়া  রাজমনি হোটেলের প্রবেশদ্বারে লেখা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুল্লাহ (স:) কালিমাটি  দেখছেন। আর প্রশ্ন করছেন- সবই পুড়ল, কিন্তু কালিমা অক্ষত-এটি কীভাবে সম্ভব।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবারের আগুনে রাজমনি হোটেলের সামনের সাটার পুড়ে গেছে। দোকানের হাঁড়ি-পাতিলসহ আসবাবপএ পুড়ে গেছে। কালি ও কেমিক্যালের ধোঁয়ার চিহ্ন লেগে আছে হোটেলের সাদা দেয়ালে। আর এই হোটেলের কর্মচারীরা বেঁচে আছেন কিনা কেউ বলতে পারছেন না।

আজ শুক্রবার  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান বলেছেন, ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা একটা দাহ্য পদার্থ। এ ছাড়া অন্যান্য কেমিক্যাল ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। সকালে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ সব কথা বলেন।

এসময়ে এস এম জুলফিকার রহমান বলেন, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে রাসায়নিকের মজুত ছিল। কেমিক্যালের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ভবনগুলোর মধ্যে সুগন্ধির ক্যান ছাড়াও লাইটার রিফিল করার ক্যান ছিল। এগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে।

বৃহস্পতিবার চকবাজারের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেছিলেন, ‘পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাসায়নিক গুদামের কোনো সম্পর্ক নেই, ওই ভবনে কোনো রাসায়নিক গুদামও নেই।’

বুধবার রাত ১০টার পর রাজধানীর চকবাজার এলাকার নন্দকুমার দত্ত সড়কের চুরিহাট্টা মসজিদ গলির রাজ্জাক ভবনে আগুন লাগে। রাত ১টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে আগুন ভয়াবহ আকারে আশপাশের ৫টি বিল্ডিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ৩২টি ইউনিট রাত ৩টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ জনে।

ফায়ার সার্ভিসের ১৫ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয় ৭০টি মৃতদেহ। এ ছাড়া আরো ১১টি মৃতদেহ বিভিন্নভাবে পৌঁছায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক)। এর মধ্যে শনাক্ত হওয়া ৪০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যাদের মরদেহ শনাক্ত হয়নি, তাদের পরিবারকে আগামী রবিবার সকাল ৯টায় মালিবাগ সিআইডি অফিসে রক্তের নমুনা দেয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এখনো অনেকেই তাদের প্রিয়জনের লাশের অপেক্ষায় হাসপাতালের মর্গে ।

চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন রোহান। রোহানের মায়ের আকুতি অয় নাই। অর লাশ লাগব না। শরীরের একটা টুকরা দেন। আমি ওইডা নিয়াই বাচুম।’ কথাগুলো নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রোহানের মায়ের।তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন ছেলের লাশ নিতে।কিন্তু রোহানের শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে, লাশ শনাক্ত করা যাচ্ছে না।এখন লাশ শনাক্ত করতে মাকে দিতে হবে ডিএনএ নমুনা।

কিছুক্ষণ পর পর অজ্ঞান হয়ে পড়া এই মা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, আমার ছেলেডারে আইনা দাও। আমি জানি অয় (সে বেঁচে) নাই। অর লাশ লাগব না। শরীরের একটা টুকরা দেন। আমি ওইডা নিয়াই বাচুম।

এর কিছুক্ষণ পরই রোহানের মায়ের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে আসা সিআইডি টিম।

সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন গণামাধ্যমকে জানান, ৪৫ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের লাশ শনাক্ত করতে বেশ সময় লাগতে পারে।

তিনি জানান, যারা লাশের সন্ধানের জন্য এসেছেন তাদের বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানদের রক্তের নমুনা রাখা হবে। যদি তারা না আসেন, তা হলে ভাইবোনদের নমুনা রাখা হবে। তবে পুরো বিষয়টির জন্য সময় লাগবে ৭ থেকে ২১ দিন।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে নিহত রোহান বিয়ের কেনাকাটা করতে চার বন্ধুকে নিয়ে বের হয়েছিলেন। আরও কিছু কাজও ছিল তার। সব শেষ করে বাসায় ফেরার কথা ছিল।

মতামত জানান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here