পাখিদের কিচির-মিচিরে মুখরিত ভূঞাপুর-মধুপুর

286

খন্দকার শাহীন আফরোজঃ

টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর,মধুপুর ও ধনবাড়ী,গোপালপুরসহ টাঙ্গাইলজেলা সদরের,যমুনা নদীসহ বিভিন্ন বিলে এবং বাওর হাওড়গু এলাকার চারিপাশসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে এখন মুখরিত অতিথি পাখী। দিগন্ত জোড়া সরিষার ক্ষেতে পাখীদের ডানামিলে ভেসে বেড়ানো নন্দন দৃস্টিকাড়ে এসব অতিথি পাখী!এলাকার মানুষের ঘুম ভাঙ্গে এসব পাখিদের কিচির-মিচির শব্ধে । অতিথিী পাখীরা শীত প্রধান দেশগুলো থেকে আসছে রং-বেরংয়ের নানা প্রজাতির পাখি। আর এসব পাখির ভিড় জমছে সবুজ  শ্যামল নদী-দিঘীজলাশয়সহ গ্রামের বাগবাগিচায়-বাশঁঝাড়ে।

ভোর হলে কুয়াশার বুক চিরে ডুবো চরে-দীঘিরজলে ভেসেবেড়ায়,কখনো বসে থাকা দেশি-বিদেশি পাখির মিলন মেলা প্রকৃতি প্রেমীদের এখন বিনোদন। শুরু হয় যমুনার চরে  স্বচ্ছ জলে,যমুনার চারিপশে সবুজ গাছের আগডালে পাখিদের খুঁনসুঁটি। যমুনার বুকে ডুব সাঁতার, পাশের দীঘিতে কখনো আবার ঝাঁক বেধে আকাশের নীলে ওড়াউড়ি চোখ ধাদানো ডানার ঝাপটা। আর যখন সন্ধ্যার আকাশে গোধূলির সোনালি রঙ ছড়িয়ে পরে, তখনি শুরু হয় পাখিদের মিছিল। কিচির-মিচির ছন্দের তালে সাঁড়ি বেধে ফিরে যাওয়া নীড়ে মেঠো গ্রামের বাগবাগিচায় বড়ৈ,কামরাঙা,শীলকড়ৈ,পাকর বটগাছে ও বাঁশ ঝাড়ের অস্থায়ী নিড়ে। এলাকার সূত্রে জানা গেছে, এসব অতিথি পাখী দল বেঁধে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে ।

শীতের মাত্রা যত বাড়ছে, অতিথি পাখির আগমনও তত বাড়ছে। আর এসব পাখির একটাই ঠিকানা যমুনার চারিপাশে এবং আশেপাশের গ্রামে বেড়ে উঠা বৃক্ষ-বাশঁঝাড়গুলোতে। শীতের মৌসুমী পাখি আর দেশীয় শালিক-টিয়া ও বাদুরের জন্যে এলাকার বৃক্ষগুলো যেন অভয়াশ্রম। যমনুনার বাংলোর পিছনে সামনে  গাছগুলোতে শত শত অতিথি পাখির কলতানে মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি যা ভ্রুমন বিলাসীদের মনের গভীরে এক অজানা কাব্য তৈরী করছে। প্রায় প্রতিদিন ওরা আসছে প্রকৃতির টানে দূর-দূরন্ত থেকে।

যমুনার নদী মধুপুরের পাহাড়, বন আর স্বচ্ছ জলধারা অতিথি পাখিকে বেশি আকর্ষণ করে। শীত এলেই টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর-মধুপুরের শালবন এলাকার গাছগুলোতে দেখা মিলে হাজারো অতিথি পাখি। সুদূর সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন শীত প্রধান দেশ থেকে পাহাড়ে এসেছে ফ্লাইফেচার, জলকুট, পর্চাড, জলপিপি, পাতারী, গার্নিগি, পাস্তামূখী, নর্দানপিন্টেল, সাড়ঁশসহ নানা প্রজাতির পাখি ছুটে আসে এই অঞ্চলে। অতিথি পাখীদের সাথে যোগ দিয়েছে দেশীয় সরালি, ডাহুক, পানকৌরি, বক, বালিহাঁস সহ নানা প্রজাতির পাখি। পাখির কলকাকলিতে মুখর এই অভূতপূর্ব সৌন্দয্য উপভোগ করতে। জানা যায় টাঙ্গাইল জেলা সদরেও  ডিসির ও এসপি লেক এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন প্রকৃতি প্রেমিরা প্রতিদিন।

ঐতিহাসিক চলনবিলাঞ্চলে এখনও মুখরিত  অতিথি পাখির কলগুঞ্জন। ভিনদেশী বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা এ সময় বদলে দিতো এ অঞ্চলের চিরচেনা দৃশ্যপট। এখনও ঝাঁক বেধে উড়ে যাওয়া অতিথি পাখিদের বিচরন নেই বললেই চলে। বিগত বছরের চেয়ে এ বছর তুলনায় এবার সংখ্যা নেহাতেই নগন্য।

স্থানীয় প্রবীন ব্যাক্তি ও পাখি বিশেজ্ঞ জানান, যমুনা নদীর বিশাল এলাকায় ছোট বড় অসংখ্য বালু চর ছাড়াও জেলার বৃহত্তম দিঘী রায়গঞ্জ উপজেলার জয় সাগর ও তার আশে পাশে রয়েছে অসংখ্য বিল ও দিঘী। এ গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জলাশয় উদয় দিঘী, রাম দিঘী ,অন্দিহার দিঘী, বেহুলার বিল, বারানির বিল, কাতলার বিল, কালিদহ সাগর ও নয়া পুকুর। ধড়াইল বিল, কচিয়ার বিল, সিমলার বিল ঐতিহাসিক অনুখার দিঘীর প্রভৃতি। এছাড়াও তাড়াশ উপজেলার প্রান্ত ছুয়ে সুদুর চাটমোহর ও নাটর এলাকা পর্যন্ত বিস্তর চলন বিল পাখিচারণ ক্ষেত্র হিসেবে সুদূর অতীত থেকেই সমৃদ্ধ।

সুদূর সাইবেরিয়া উত্তর চীন তিব্বত, উত্তর হিমাচল প্রদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পেড়িয়ে শুধু ডানার উপর ভর করে ঝাঁকে ঝাঁকে এ সব অতিথি পাখিরা এ দেশে এসে থাকে। এক টানা পথ চলার ক্লান্তিতে তারা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও প্রচুর খাবার সমৃদ্ধ জলাশয়গুলোতে বিচরণ করে তারা আবার সঞ্জবতা ফিরে পেতো। এ সময় অতিথি পাখিদের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে যেত উল্লেখিত এলাকার গ্রাম বাসিদের। কুয়াশা স্নাত সকালের সোনালী রৌদ্র উজ্জ্বল সূর্য স্লান সেরে নিয়ে পাখির দল নেমে পড়তো জলাশয়ে ছোট ছোট শামুক, ঘাস, শষ্যদানা, আর পোকা মাকড়ের সন্ধানে।

প্রতিবারের মত এবারও শীতের শুরুতেই এঅঞ্চলে অতিথি পাখি এসেছে চোখে পরার মত।

চোখাচোখি, গাং চিল, গাং কবুতর, চ্যাগা ও জল মোরগ,  বিভিন্ন নাম না জানা অনেক পাখি। অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত  মধুপুরের পাহাড়ি এবং টাঙ্গাইল জেলার চরাঞ্চল গুলোও।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর উত্তরের শীত প্রধান সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া ও নেপাল থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি এদেশে আসে। এ সময় সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের উত্তরে শুরু হয় প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাত। তাই ওখানে পাখিরা থাকতে পারে না। নিজেদের বাঁচাতে এরা ডানায় ভর করে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশসহ সংলগ্ন নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে। দেশের হাতেগোনা যে কয়েকটি এলাকায় এরা ক্ষণস্থায়ী আবাস গড়ে, তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের বনাঞ্চলগুলোতে।

তিনি আরও বলেন, মূলত অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের প্রথম দিকেই বনগুলোতে তাদের আসতে দেখা যায়। আবার মার্চের শেষদিকে  ফিরে যায় পাখী তার আপন ঠিকানায়। এরা আমাদের দেশের অতিথি। তাদের নিরাপত্তা দেওয়া সবার দায়িত্ব-কর্তব্য। পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। পাখি নিধনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনত কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  তাছাড়া পাখি শিকার বন্ধের জন্য সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here