টাঙ্গাইলের কাসাঁ ইতিহাস কাঁসা দৃশ্যমান হবে কোন জাদুঘরে অথবা অতি প্রবীণ কোন মানুষের কুটিরে

71

খন্দকার শাহীন আফরোজ:টাঙ্গাইলের কাসাঁ দিয়ে ঘরগৃস্থালীর কাজে প্রদীপ মোমদানি চিলিমচি সৌন্দর্যবর্ধক কোন জিনিস ও কেউ কেউ বানিয়ে নেয় ।তবে কাসাঁরীদের দাবি কাঁসার জিনিস বানিয়ে তেমন লাভ নেই। বেশি দরে কাঁচামাল কিনে জিনিস বানিয়ে বিক্রি করে কতই বা লাভ হয় জানালেন তিরুহিৎকর কর্মকার।তিনি বলেন, কাঁসা এক ধরনের ধাতু। বিগলন ঢালাই প্রযুক্তির মাধ্যমে জিনিস বানাতে হয়। দরকার হয় বিশেষ ধরনের ছাঁচের। এগুলো এখন সহজে মেলে না। ভাস্কর্য তৈরি পদ্ধতিও আলাদা। মোম দিয়ে অবয়বের পর নক্সা ও সূক্ষ্ম কারুকাজ করে দিতে হয় তিন স্তরের মাটির প্রলেপ। তারপর পুড়িয়ে মোম গলে মাটির ছাঁচে লেগে যায়। গলানো কাঁসা সেই ছাঁচে ঢুকিয়ে তৈরি হয় নক্সা ভাস্কর্য।

তিরুহিৎকর জানান, ঐতিহ্য ধরে রাখতে শৌখিন লোকজনই কাঁসা কেনে। তবু এভাবেই যত দিন টিকে থাকে। খুব বেশি দূরে হয়তো নয়, যেদিন কাঁসা এ্যান্টিকসের খাতায় নাম লিখিয়ে দৃশ্যমান হবে কোন জাদুঘরে ও অতি প্রবীণ কোন মানুষের কুটিরে। এখনো টাঙ্গাইলের কাগমারীসহ জেলার নানা গ্রামাঞ্চলে এই কাঁসা ও পিতল শিল্পীরা তৈরি করছে নানা দ্রব্যাদি। ব্যাপক প্রসিদ্ধ ও চাহিদার ভিত্তিতে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থানে কাঁসা ও পিতলের শিল্প গড়ে উঠলেও কাগমারী, মগড়া ও সাকরাইল গ্রাম ছিলো বেশি প্রসিদ্ধ। এক সময় এ সকল গ্রামে শতশত পরিবার কাঁসা ও পিতল শিল্পী ছিলো। দিন রাতে তাদের কাঁসা পেটানোর শব্দে গ্রামগুলো মুখর থাকতো। হিন্দুদের মধ্যে কর্মকার সম্প্রদায়েরাই এ শিল্পের সঙ্গে বংশানুক্রমে জড়িত। টাঙ্গাইলের কর্মকারগণ অত্যন্ত সুনিপূণ কৌশলে নিরলস শ্রম দিয়ে আজো তৈরি করছে তামা, কাঁসা ও পিতলের থালা, বাটি, কলসী, গ্লাস, জগ, ঝারি, বদনা, ঘটি, লোটা, পঞ্চ প্রদীপদান,মোমবাতিদান আগর বাতিদান, কুপি, চামচ, কাজলদানী, ডেকচি, ডেগ, বোল, খুন্তি, সড়তা, বাটি, পুতুল, ঝুনঝুনি, করতাল, মেডেলসহ প্রভৃতি জিনিস পত্র।এক কালে টাঙ্গাইল অঞ্চলের জমিদার ও ভূ-স্বামীগণের বড় তৈজসপত্র ছিলো এ গুলো। এদেরই সহায়তায় এসব কারিগর সমাজ নিত্য নতুন জিনিস তৈরি করেছে। প্রভুর মনোরঞ্জনের জন্য। জমিদার গণ ও ছিলেন বৈচিত্র প্রয়াসী তারাও চাইতেন নানা কারুকার্য খচিত কাঁসার বাসনপত্র উপযুক্ত সহায়তা এবং সমাদরের অভাবে এই শিল্প অন্ধকারে ধূকছে। আজ বিয়ে-শাদী, অন্নপ্রাশন ও সুন্নতে খতনা কিংবা সে ধরনের কোন অনুষ্ঠানে কেউ পিতলের কলসী, কাঁসার জগ, গ্লাসও চামচ উপহার দেয় না। এক সময় কাঁসা ও পিতলের তৈরি জিনিসপত্র বিয়ে, মুসলমানিসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সেরা উপহার হিসেবে বিবেচিত হতো।হাজার বছরের পুরনো এ শিল্প ইতিহাসে প্রমাণ আছে। গ্রাম সমবায়ে কাংস্যকার, কাংস্যবণিক ইত্যাদি বৃত্তিধারী শ্রেণী ছিল। পাঠান, মোগল ও বৃটিশ শাসনামলে কাংস্যকার যখন যে রূপ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল, সেরূপ বিকাশ লাভ করতে পেরেছিলো। কাগমারীতে যারা তামা, পিতল, কাঁসা শিল্পের সাথে জড়িত তাদের বংশগত উপাধি কর্মকার। কাংস্যকার বা কাংস্যবণিক বলে কাউকে কাঁসা শিল্পের সাথে জড়িত দেখা যায় না। তবে কাগমারী কাংস্য শিল্পের সুনাম ছিল এবং এখনো আছে। টাঙ্গাইলের বরাইল ও কাগমারীতে পিতলের কাজের প্রধান্য রয়েছে। টাংগাইলের কাগমারী ও মগরা দুটি গ্রামে উপরোল্লোখিত জিনিস ছাড়া আরো তৈরি হয় কাঁসার ঘণ্টা, জয়ঢাক, তামার কুশা-কুশি, টাট পুষ্পাধার ইত্যাদি।দিন বদলেছে। আধুনিক প্লাস্টিক, এলোমেনিয়ামের ও মেলামাইনের তৈজসপত্রের আমদানীতে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা ও পিতল শিল্পের উন্নয়নে প্রচুর কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা আধুনিক মেশিনারির ব্যবস্থা এবং বাজারের চাহিদানুযায়ী আধুনিক রুচিসম্মত জিনিস তৈরির ব্যবস্থা না থাকার কারণে এ শিল্পের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী এই লোক শিল্পটি আজ বিলুপ্তির পথে। কাঁসার তৈরি জিনিস পত্রের দাম বর্তমানে এতো বেশি যে, সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। দামে সস্তা হওয়ায় বিকল্প হিসেবে স্টিল, মেলামাইন, চিনামাটি, কাচ ও প্লাস্টিকের সামগ্রী কাঁসা শিল্পের বাজার দখল করে নিয়েছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তির লোক শিল্পের দাপটে প্রাচীন লোক শিল্পটি ক্রমশই বিলুপ্ত হতে চলেছে।এছাড়া দেশের স্বাধীনতার পর চোরাই পথে ব্যাপকভাবে এখানকার কাঁসা ও পিতলের তৈরির জিনিস পত্র ভারতে পাচার হতে থাকা এবং অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক দক্ষ কারিগর দেশ ত্যাগ করাতে এই শিল্পের উপর বিপর্যয় নেমে আসে। এখন এই শিল্পের সাথে জড়িত কর্মকার সম্প্রদায়ের শতশত পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। টাঙ্গাইলের কাগমারী ও মগরা দু’টি গ্রামে বাস করে অনাধিক ৫০টি পরিবার। তারা কেউ কেউ বেছে নিয়েছে অন্য পেশা। ফলে কমে যাচ্ছে কাঁসা ও পিতল শিল্পীর সংখ্যা। টাঙ্গাইল জেলা সদরে এই শিল্পের দোকান থাকলেও বেচাকিনি নাই বললেই চলে। তাই এই শিল্পের মন্দাভাব দিন দিন বাড়ছে। এধারা অব্যাহত থাকলে এবং সরকারি ভাবে উদ্যোগ না নিলে টাঙ্গাইলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যাবাহী এ লোক শিল্পটি কালের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাবে এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই।বাঙালী রমনীর কণ্ঠে ধ্বনিত হবে না নানা রকমের মিষ্টি সুরের প্রেমের লোক গান। কতই না গান রচিত হয়েছিল কাঁসা ও পিতল শিল্প নিয়ে।পরিশেষে বলা যায়, মহাজনী পুঁজি প্রবেশ লাভ করেছে এ লোক শিল্পে। এতে কারিগর শ্রেণী দ্রুত মজুরে পরিণত হবে অথচ গড়ে উঠতে পারবে না এ লোক শিল্প শক্ত ভিতের উপর। উপযুক্ত প্রযুক্তির অভাব হেতু ক্ষুদ্রায়তন শিল্পে রূপান্তরিত হওয়ায় সুযোগও আজ অনুপস্থিত।দ্বিতীয় কিস্তি: আগামীকাল চলবে শেষ কিস্তি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here