গ্রাম বাংলার সোনালী ফুল আধুনিক নগর জীবনে সৌন্দর্যের শোভা সোনালু

94

খন্দকার শাহীন আফরোজ: গ্রাম বাংলার সোনাঝরা বা সোনালী ফুল আধুনিক শহর জীবনে এসে এই ফুলের নাম হলো সোনালু। এই সোনালী ফুল এখন রাজধানীর রাজপথ থেকে অলিগলির মুখের সৌন্দর্য শোভ ছড়িয়ে দিয়েছে। ছোট সময় মা চাচি দাদী-নানীর কাছে ছোট সময় গল্প শুনেছি সোনালী বা সোনাঝরা ফুলের গল্প,সেই কিশোরীর কানের দুলের মতো বৈশাখী হাওয়ায় দুলতে থাকে হলুদ-সোনালি রঙের থোকা থোকা ফুল। আবার ফুলের ফাঁকে দেখা যায় লম্বা খয়েরী ফল যার নাম বান্দর লড়ী। হলুদবরণ সৌন্দর্যে মাতোয়ারা করে রাখা চারপাশ। লাঠির মতো দেখতে এই ফলকে বান্দরের ফল বলেই জানতাম ,আবার বলা হতো বান্দর নড়ি! দাদী নানী বলিতেন এই লম্বা লম্বা ফলের নাম করন কে বা কারা দিয়েছে বান্দর নড়ি জানা নেই। তবে এই ফলটি নাকি বানরের বেশ প্রিয় ফল থেকেই নাম করণ বলে জনশ্রæতি রয়েছে!
হা প্রিয় পাঠক আপনি গ্রামে কিংবা শহরে বা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অথবা কোন পার্কে হাটলেই গ্রীষ্মের এই দিনে আপনার চোখে পড়বে । প্রখর রোদে মৃদু হিমেল হাওয়ায় দুলছে হলুদ সোনালী এই সোনাঝরা ফুল।
প্রখড় এই তাপদাহে চলার পথে পথিকের নজর কাড়বেই। গ্রীষ্মের প্রকৃতি কে প্রাণবন্ত করে তুলেছে যেসব ফুল তার মধ্যে সোনাঝরা ফুলও কিন্ত বেশ সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে দিয়েছে রোদেলা দুপুরে কিংবা পরন্ত বিকালে। গ্রীষ্মের প্রকৃতিকে রঙিন রঙে রাঙানো এ ফুল দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি তার নামের বাহার- সোনালু, সোনাইল, সোঁদাল,আর এই ফুল থেকে যে ফল হয় তাকে বান্দরলাঠি বা বান্দরের ফল বলেই গ্রাম বাংলায় প্রচলন সেই আদি থেকে। আধুনিক ডিজিটাল এই যুগে এসেও বান্দরনড়ি বা বান্দর লাঠি নামেই পরিচিত। কোন আধুনিক কবি বা সাহিত্যিক এর নামের নতুনত্ব আনেননি কিংবা সম্ভব না বলেই হয়তো নতুন নাম দেননি কেউ।
তবে তথ্য উপাত্যে জানা যায় সোনাঝরা ফুলের আদিনিবাস পূর্ব এশিয়তেই। তবে হাজার বছর আগেও এ গাছ আমাদের উপমহাদেশে ছিল এখনো আছে। এই ফুলের বিস্তর মহাকবি ব্যাস-এর ভগবত কিংবা কালিদাস-এর মেঘদূত-এ ফুলের আদি অন্ত নিয়ে বেশ আলোচনা রসালো ইতিকথা হয়েছে।
উদ্ভিদ বিষয়ক একাধিক জার্নাল মারফত জানা যায়, সোনালু গাছ আকারে বেশ বড়। আবার মাটির গুনাগুণে গাছটি অনেক জায়গায় বনসাই সাইজেও হয়ে থাকে। এর ডালপালা ছড়ানো-ছিটানো। দীর্ঘ মঞ্জুরিদন্ডে ঝুলে থাকা ফুলগুলোর পাপড়ির সংখ্যা পাঁচটি। সবুজ রঙের একমাত্র গর্ভকেশরটি কাস্তের মতো বাঁকানো। এ গাছের ফল বেশ লম্বা, লাঠির মতো গোল। তাছাড়া এর ফল, ফুল ও পাতা বানরের প্রিয় খাবার। এজন্য এ ফুলের আরেক নাম বান্দরনড়ি। গাঢ় সবুজ রঙের পাতাগুলো যৌগিক, মসৃণ ও ডিম্বাকৃতির। ফুল এক থেকে দেড় ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া শিকলের মতো কিংবা ঝারবাতির ন্যায় নিচের দিকে নেমে যায়। মৃদু বাতাসের ফাকে ফাকে দোলে তবে জ্যো¯œা রাতে আধো আলোআধারীতে দারুণ দেখতে।
এ গাছের কাঠ জ্বালানি ছাড়াও অন্যান্য কাজে লাগে। ফলের শাঁস বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে কাজে লাগে। বাত, বমি ও রক্ত শ্রাব টনসিল এ গাল ফলে গেলে এই গাছের ফল থেকে যে নির্জাস বাহির করে চিনি চুন দিয়ে আগুনের তাপে কুসুম গরম করে প্রলেপ লাগিয়ে দিলে অনেকটাই সাময়িক টনসেল ব্যাথা থেকে আরাম দায়ক। বীজ সহজেই অঙ্কুরিত হয়, যদিও বৃদ্ধি মন্থর গতিতে। এছাড়াও এ গাছের বাকল, রঙ ও ট্যানিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়।
গ্রীষ্মের এই দিনে গ্রামের পথের দ্বারে বন জঙ্গলে একসময় অনেক সোনালু গাছ চোখে পড়তো। এছাড়াও হাট, বাজার ও গঞ্জের চারপাশেও দেখা যেত হলুদিয়া সাজের সোনালুর বা সোনাঝরা ফুলের দেখা মেলতো। এখন হাতেগোনা কিছু গাছ দেখা যায় পথে প্রান্তরে। দিন দিন কমে আসছে সোনালুর সংখ্যা। তবে ইদানিং কিছু গাছ দেখা যায় রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার উপরে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায় এ গাছগুলো সিটি কর্পোরেশন বেশ কিছুদিন পূর্বে নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে রোপন করেছিলো।
তবে রমনা পার্কে বলদা গার্ডেনে প্রাকৃতিকভাবেই যা হয়, তার ওপর ভর করেই হলুদ-সোনালি রঙের সৌন্দর্য বিতরণ করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে সোনালু। এক সারিতে বেশ কয়েকটি গাছে যদি ফুল ফোটে তাহলে সে দৃশ্য বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। সোনালু গাছ সাধারণত যত্ন করে লাগানো হয় না বরং সে নিজেই বেড়ে ওঠে অযতেœ অবহেলায়। নিরবে বেড়ে ওঠে, থাকেও নিষ্প্রাণ নির্ঝঞ্ঝাট ভাবে। যখন ফুল ফোটে তখন কারো সাধ্য নেই এই গাছের দিকে চোখ কিছু সময়ের জন্য হলেও “কবির ভাষায় বলতেই হয় ঈশ্বরের সৃস্টির যেনো শেস নাই, যে দিকে চোখ যায় কি অপরুপ রুপে তুমি সাজিয়ে দিয়েছো প্রকৃতিকে ” তাইতো আমার এই চোখ দুটো স্বার্থক হে ঈশ্বর ভগবান আল্লাহ তোমার অপার সৃষ্টিতে! ফুল ফোটার পর দেখে সবার মন-প্রাণ প্রশান্তিতে ভরে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here