আগুনে পুড়ে মৃত্যুর রেকর্ড

23

আর মাত্র ১১ দিন পর ২০১৯-কে বিদায় জানিয়ে আগমন ঘটবে ২০২০-র। নানা ঘটনার মধ্যে এ বছরের সবচে আলোচিত বিষয় ছিলো ‘আগুন’। কারণ ২০১৯ বছরটিতে বেশকবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যাতে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। দগ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছেন অনেকেই। শুধুমাত্র চলতি বছরের প্রথম এগারো মাসে সারাদেশে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে ২২ হাজারেরও বেশি।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ছোট-বড় মোট ২২ হাজার ২৮৩টি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে যার সংখ্যা ৩ হাজার ১৭৭টি।

আর হিসাব বলছে গত ২৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকান্ড ঘটেছে ২০১৯ সালে। এসব অগ্নি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের ২শ’ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। যা একটি সভ্য দেশে কোনক্রমেই কাম্য নয়। এ প্রতিবেদনে এমনই কিছু আলোচিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরা হলো।

চকবাজারের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড
এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ৯ বছর আগে সংঘটিত নিমতলী ট্র্যাজেডিরই পুনরাবৃত্তি করে।

২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলী অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিল ১২০ জনেরও বেশি নারী-পুরুষ।আর চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশের চারতলা ভবনে লাগা আগুনে প্রাণ হারান ৭৮ জন মানুষ। সে সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্তত পাঁচটি ভবন।

ভাসানটেক বস্তিতে আগুন
চকবাজারের পর ভাসানটেক বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২৭ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) রাতে। এ আগুনে পুড়ে যায় প্রায় হাজারখানেক বস্তিঘর। আগুনের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সময় মায়ের কোল থেকে পানিতে পড়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর ঘটনার পরদিন সকাল আটায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সক্ষম হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী— রাত দেড়টার দিকে পশ্চিম দিকের আবুলের বস্তির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় আগুন দেখা যায়। ওই সময় বস্তিবাসীরা ঘুমাচ্ছিলেন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। কারণ বস্তিগুলো বাঁশ, কাঠ আর টিন দিয়ে তৈরি। সেগুলো ছিলো শুকনো। ফলে আগুন দ্রুত ধরে যায়।

প্রায় প্রতিটি বস্তিঘরে ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক লাইন আর গ্যাস সিলিন্ডার ছিলো। আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরিত হতে থাকে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ার কারণে আগুন চোখের পলকে পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বস্তিবাসীরা জীবন বাঁচাতে দৌড়াদৌড়ি করে নিরাপদ জায়গায় চলে যাচ্ছিল। ঘরে থাকা শিশুদের পিতামাতারা কোলে নিয়ে বস্তিতে থাকা বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হচ্ছিলেন।

হুড়োহুড়িতে মায়ের কোল থেকে দুটি শিশু পড়ে যায়। গভীর রাতে অন্ধকারের মধ্যে তাদের আর পিতা-মাতারা খুঁজে পায়নি। বস্তি দুটিতে অন্তত পাঁচশ দোতলা ঘর অর্থাৎ একহাজার ঘর ছিলো। প্রতিটি ঘর বাঁশ, কাঠ আর টিন দিয়ে করা হয়েছিল।

এফআর টাওয়ারের আগুন
এ বছরের ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৬ জন ব্যক্তি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন শ্রীলঙ্কার নাগরিকও ছিলেন। আগুন থেকে বাঁচতে বেশকিছু মানুষ ভবন থেকে লাফ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়াও আহত হন ৭৩ জন।

কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় আগুন
গত ১১ ডিসেম্বর বুধবার কেরানীগঞ্জ উপজেলার চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকার প্রাইম পেট অ্যাণ্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ২১ জন। কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় পুড়ে যাওয়া কর্মীদের ভয়াবহ অবস্থায় চিকিৎসকরাও আঁতকে ওঠেন।

পুড়ে যাওয়ার ভয়াবহতা বোঝাতে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যাণ্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, দেশে এখন পর্যন্ত যত আগুনে দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে সর্বোচ্চ বা বেশি মাত্রায় পোড়া রোগী এসেছে কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানার অগ্নিকাণ্ডের পর। ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় এত ভয়াবহ বার্ন রোগী দেখিনি।

২০১৬ সালে এরপর চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল কারখানাটিতে আগুন লেগেছিল। তবে ওই দুটি অগ্নিকাণ্ডে কারখানার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তবে সর্বশেষ অগ্নিকাণ্ডটি কেড়ে নেয় অনেকের প্রাণ। এ ঘটনায় কারখানার মালিক নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যামামলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি গ্রেপ্তার হননি।

গাজীপুরে ফ্যান তৈরির কারখানায় আগুন
গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের কেশোর্তা এলাকার ফ্যান তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ১০ জন। ১৫ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গাজীপুর সদর উপজেলার কেশোর্তা এলাকায় দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে রওজা হাইটেক নামের কারখানা গড়ে তোলা হয়।

কারখানাটিতে লাক্সারি নামের ফ্যান তৈরি করা হয়। কারখানার তৃতীয় তলার একটি টিনশেড ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ঘটনার সময় কারখানায় ১৯ জন কর্মরত ছিলেন। আগুনে দগ্ধ হয়ে ১০ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।

ক্ষয়ক্ষতি
এ বছর রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে ঘটেছে আগুনের ঘটনা। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পাশাপাশি সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২০ নভেম্বর আগুন লাগে টিকাটুলির রাজধানী সুপার মার্কেটে।

এতে বিভিন্ন মালামালসহ পুড়ে যায় অনেকগুলো কাপড়ের দোকান। আর ৩০ মার্চ আগুন লাগে গুলশান ১-এর ডিএনসিসি মার্কেটে। আগুনে মালামাল পুড়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে মার্কেটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেছেন, অপরিকল্পিতভাবে দোকান বরাদ্দ দেয়ায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকাসহ সঠিক দেখভালের অভাবই দায়ী।

অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে শ্রমিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আবু নাসের খান আমার সংবাদকে বলেন, এ ধরনের বিল্ডিং, গুদাম, কারখানা বা দোকানের বেশিরভাগের নিবন্ধন বা লাইসেন্সসহ কোনো কাগজপত্র নেই।

এসব ব্যবসায়ী এবং তাদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নিজেদের ব্যবসা চালাচ্ছে কোনো নিয়ম-নীতি না মেনেই।

এমনকি শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও আগ্রহ নেই তাদের। অগ্নিকাণ্ড যেকোনো সময় ঘটতে পারে। সেজন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি ভবনে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here