অনিশ্চিত কারওয়ান বাজার স্থানান্তর

18

ট্রাক প্রবেশ বন্ধ ছাড়া বাজার স্থানান্তর সম্ভব নয়: ডিএনসিসির কর্মকর্তা
অবৈধ দোকান গড়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রভাবশালীরা
যানজট নিরসনে কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারসহ তিনটি চিকেন মার্কেট স্থানান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হক। এ লক্ষ্যে সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা শহরের মহাখালী, যাত্রাবাড়ী ও আমিনবাজারে তিনটি পাইকারি বাজার নির্মাণ করেন।

এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করতেন। সে সময় মেয়রের সঙ্গে বৈঠকে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরলে তা সমাধান করেন। এরপরও ব্যবসায়ীরা দোকান সরাতে গড়িমসি করেন। মেয়রের মৃত্যুর পর উদ্যোগটি একপর্যায়ে থমকে গেছে। ফলে মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্নের নগরীর প্রত্যয় যেনো ভুলতে বসেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন।

জানা গেছে, কারওয়ান বাজারে বিদ্যমান ব্যবসায়ী ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় বাজার সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনটি বাজার পুরোপুরি প্রস্তুত হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কারওয়ান বাজার সরানোর প্রক্রিয়া থেমে আছে।

৩৯ বছর আগে গড়ে উঠা কারওয়ান বাজার এখন রাজধানীবাসীর কাছে বিষফোঁড়া। কারওয়ান বাজার মানেই এখন যানজট, ময়লা, আবর্জনা, কাঁদাযুক্ত এলাকা। সর্বোপরি এখানে বিরাজ করছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজট।

সামান্য বৃষ্টিতেই বাজারের অবস্থা আরো অসহনীয় হয়ে উঠছে। রাত ১০টার পর শত শত ট্রাক কাঁচামাল নিয়ে কারওয়ান বাজারে ভিড় করছে। সারা রাত ধরে চলে মাল ওঠানো-নামানো। কারওয়ান বাজারের এই ব্যস্ততার প্রভাব গিয়ে পড়ে মূল সড়কে, এমনকি রেল লাইন ও তার আশপাশে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কারওয়ান বাজার এলাকায় রাজউক ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তালিকাভুক্ত আড়াই হাজার দোকান রয়েছে। তালিকার বাইরে রয়েছে আরো অনেক দোকান। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যুগে যুগে এসব দোকানপাট গড়ে তুলেছেন।

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল হামিদ আমার সংবাদকে বলেন, ‘সকলের প্রচেষ্টা ছাড়া সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয় কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের স্থানান্তর করা।

২০০০ সালে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়— এটি স্থানান্তর করে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করার। যাত্রাবাড়ী ও আমিনবাজারে মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে।

আর মহাখালীতে মার্কেট তৈরি হয়েছে, সেখানে দোকান বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও গ্রহীতা না পাওয়ায় অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। পুনরায় মার্কেটটি উপযোগী করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বাস্তবতা হলো— নতুন জায়গায় ব্যবসা করতে গেলে কিছুদিন ব্যবসা মন্দ হয়, সেই ধ্যান-ধারণা থেকে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা সিটি কর্পোরেশনের নতুন তিনটি মার্কেটে দোকান বরাদ্দ নিচ্ছেন না।

তবে কিছুদিনের মধ্যে কারওয়ান বাজারের মাছের বাজার যাত্রাবাড়ীতে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারওয়ান বাজারে সবজির ট্রাক প্রবেশ বন্ধ করে দিলে অটোমেটিক ব্যবসায়ীরা আমিনবাজার, মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে যাবেন।’

এছাড়া কোনো উপায় নেই বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন ও ফয়জুল্লাহ খন্দকারের মতে, কারওয়ান বাজারে দোকান বরাদ্দ পেয়েছিলেন।

এখন নতুন নির্মিত বাজারে দোকান নিতে প্রতি বর্গফুটের জন্য ২৫ হাজার টাকা সালামি দিতে হবে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আবেদন করেননি। কারওয়ান বাজারের দোকানগুলো চারদিকে খোলা। নতুন বাজারগুলোতে দোকানগুলো বদ্ধ ও ছোট। সেগুলো আড়তের উপযোগী নয়।

যানজট কমাতেই বাজার সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা : রাজধানীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কারওয়ান বাজারকে ঢাকার চারটি স্থানে সরিয়ে নেয়ার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই চারটি বাজার হলো— মহাখালী, আমিন বাজার, যাত্রাবাড়ী ও লালবাগ।

তবে লালবাগ প্রকল্পটি পরে স্থগিত করা হয়েছে। তিনটি কাঁচাবাজার ৩৩১ কোটি আট লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালের ২৬ এপ্রিল একনেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, বিদ্যমান কারওয়ান বাজারের দোকানমালিকদের এই চার বাজারে পুনর্বাসন করা হবে। দোকান বরাদ্দে মূল্য আদায় করা হবে না। এখান থেকে প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে না।

তবে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের সুবিধা, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি, বাজারভেদে শাক-সবজি ও কৃষিপণ্যের মূল্য পার্থক্য হ্রাসসহ, পচনশীল পণ্য সংরক্ষণে সুবিধা পরোক্ষভাবে আর্থিক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।

তিনটি বাজার নির্মাণ সম্পন্ন : মহাখালীর বাজারের জন্য তিনটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। মোট জমির পরিমাণ ৭ দশমিক ১৭ একর। ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৬০টি দোকান নির্মাণ শেষে বরাদ্দ চলছে। একইভাবে যাত্রাবাড়ী এলাকায় ৫ দশমিক ২১ একর জমিতে আরেকটি কাঁচাবাজার নির্মাণ করা হয়।

মোট ৮৯৫টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনেই বেইজমেন্ট ও গ্রাউন্ড ফ্লোর আছে। গাবতলীর আমিন বাজার এলাকায় ১৩ একর জমির উপর কাঁচাবাজার নির্মিত হচ্ছে। ১২৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।

ইতোমধ্যে চারটি ভবনের প্রায় ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মোট ৫৪৯টি দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। লালবাগের প্রকল্পটি জনসাধারণের চাপের মুখে স্থগিত করা হয়।

দোকান বাণিজ্য : অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীর বাজারের দোকান বরাদ্দের নামে বাণিজ্য করেছে। ১২০ বর্গফুট দোকান ২১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ৩০ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ফ্লোর অনুপাতে প্রতি বর্গফুটের জন্য নেয়া হয়েছে ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

আর কারওয়ান বাজারের বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাত্র ২০ শতাংশ কম মূল্যে দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ সরকার বিনামূল্যে এই দোকান বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দোকান বরাদ্দ হলেও কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা এখনো এসব নতুন মার্কেটে আসেননি। আগের মতোই কারওয়ান বাজারে ব্যবসা করছেন।

কারওয়ান বাজারে কারপার্কিংও অপ্রতুল : ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, কারওয়ান বাজার এলাকায় ৩১টি হাইরাইজ বিল্ডিং রয়েছে। আছে আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারকা একটি হোটেলও।

কিন্তু কারপার্কিংয়ের স্থান সেই তুলনায় কিছুই গড়ে উঠেনি। এ ছাড়া প্রধান সড়কের উপর যত্রতত্র কারপার্কিং, যেখানে সেখানে মাল উঠানো-নামানোর ফলে কারওয়ান বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠছে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here