৪৭% কম লোকবল নিয়ে চলছে পরিবহন বিভাগ

তীব্র লোকবল সংকট নিয়ে চলছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। প্রতি বছর নতুন নতুন ট্রেন সার্ভিস চালু হলেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন বিভাগে কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৪৭ শতাংশ কম কর্মী নিয়েই কার্যক্রম চালাচ্ছে বিভাগটি। এতে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে পিছিয়ে পড়ছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ রেল অঞ্চল।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পরিবহন বিভাগের জন্য অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ২ হাজার ৫৩৭। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৩৬৪ জন। অর্থাত্ বিভাগটিতে লোকবলের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ১৭৩ জন, যা মোট অনুমোদিত জনবলের ৪৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২০ সালের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে অবসর প্রস্তুতি ছুটিতে যাবেন আরো ৩৫৭ জন রেলকর্মী। এতে বিভাগটিতে ঘাটতি লোকবল ৬০ দশমিক ৩১ শতাংশে উন্নীত হবে, যা রেলের সুষ্ঠু ও নিরাপদ সেবা প্রদানে প্রধান বাধা বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলের সংস্থাপন শাখার কর্মী-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় শ্রেণীর ১৭টি মঞ্জুরিকৃত পদের মধ্যে কর্মরত ১৩ জন। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণীর ১ হাজার ২৯৫ পদের বিপরীতে ৭৭৫, চতুর্থ শ্রেণীর ১ হাজার ২২৫ পদের বিপরীতে ৫৭৬ জন কর্মরত। রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীরাই ট্রেন পরিবহনসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকেন। অথচ এ দুই ধাপেই সবচেয়ে বেশি জনবল ঘাটতি রয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পর্যায়ে যথাক্রমে ৫২০টি ও ৬৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হাই বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে লোকবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন নিয়োগ পাওয়া ১১২ জন সহকারী স্টেশন মাস্টার বিভিন্ন সেকশনে দায়িত্ব নেবেন। এর পর আগামীতে আরো ১৫০ সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খাতের ঘাটতি কমে আসবে।
জানা গেছে, কয়েক মাস আগেও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৫২টি স্টেশন বন্ধ ছিল শুধু লোকবল সংকটের কারণে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ১৪টি স্টেশন বন্ধ ছিল। তবে ২৫৭ জন সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগের পর পূর্বাঞ্চলের ২৫টি স্টেশন চালু করা হয়। তবে এখনো বন্ধ রয়েছে ২৭টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। এতে রেলের গতিবেগ কমে যাওয়া ছাড়াও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্যমতে, লোকবল সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগে বি-ক্লাস স্টেশনের মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে ভাটিয়ারী, বাড়বকুণ্ড, বারৈয়াঢালা, মীরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালীদহ, শর্শদী, নাওটি, আলী শহর, ময়নামতি, রাজাপুর, মন্দবাগ, খিলা, দৌলতগঞ্জ, বজরা, শাহাতলী, ঝাউতলা, সরকারহাট। আর আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে হাসানপুর, চিতোষী রোড ও মেহের স্টেশন। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে বন্ধ স্টেশনগুলো হলো— বেগুনবাড়ী, বাউসি, কালিয়াপ্রসাদ, লস্করপুর, টিলাগাঁও, ভাটেরাবাজার, খাজাঞ্চিগাঁও, আফজালাবাদ, ইজ্জতপুর, নরসিংদী, সুতিয়াখালী, নীলগঞ্জ, মোশারফগঞ্জ, ঠাকুরাকোনা, ইটাখোলা ও বিষকা। এ বিভাগে আংশিকভাবে বন্ধ স্টেশনের মধ্যে রয়েছে কেন্দুয়া, জামালপুর, ছাতকবাজার, শহীদনগর, বারৈপটল, হরষপুর ও বারহাট্টা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিটি বি-ক্লাস স্টেশনে সর্বনিম্ন তিনজন স্টেশন মাস্টারের প্রয়োজন। তবে ডি-ক্লাস স্টেশন পরিচালনা শুধু বুকিং ক্লার্ক থাকলেই হয়। কিন্তু স্টেশন মাস্টারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বুকিং সহকারী না থাকায় এসব স্টেশন বন্ধ রয়েছে।
এদিকে রেলওয়ে সূত্রমতে, চলতি বছর পরিবহন বিভাগ থেকে অবসর প্রস্তুতি ছুটিতে (পিআরএল) যাবেন ৯০ জন রেলকর্মী। পরের বছর আরো ৮৭, ২০১৯ সালে ৮৬ ও ২০২০ সালে পিআরএলে যাবেন ৯৪ জন কর্মী। সবমিলিয়ে আগামী সাড়ে তিন বছরে পরিবহন বিভাগ থেকে ৩৫৭ জন অবসরে যাবেন। এতে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পরিবহন শাখায় শূন্য পদের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজার ৫৩০ জনে, যা এ শাখার মঞ্জুরিকৃত মোট লোকবলের ৬০ দশমিক ৩১ শতাংশ। এতে রেলের সেবা আরো বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবহন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রেলসেবায় পরিবহন কর্মীদের ভূমিকাই প্রধান। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক কর্মী দিয়ে এ সেবার মান কোনোভাবেই বাড়ানো সম্ভব নয়। সরাসরি পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় রেলকর্মীদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কর্মী সংকটের কারণে অধিকাংশ সময়ই ওভারটাইম করতে হচ্ছে। এতে রেলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি সেবার মানেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল রেলওয়ের নিয়োগ-সংক্রান্ত অর্থ কেলেঙ্কারির পর হাইকোর্টে রিট মামলার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। রেলের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কোচ ও ইঞ্জিন সংকট কিছুটা কমলেও পরিবহন বিভাগে কর্মী সংকটে যাত্রীসেবার মান বাড়ানো যাচ্ছে না।