১৫ হাজার কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট পাস

বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের তুমুল বিরোধিতার মুখে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে। আজ সোমবার জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল-২০১৮’ পাসের মাধ্যমে এই বাজেট পাস হয়।

এই বাজেট পাসের মধ্য দিয়ে সংসদ ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৩৩৯ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের অর্থ অনুমোদনের জন্য ২৪টি মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করা হয়। এসব দাবির মধ্যে চারটি দাবির ওপর আনীত ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়। এগুলো হচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বাকি মঞ্জুরি দাবিগুলো সরাসরি ভোটে প্রদান করা হয়। অবশ্য সব ছাঁটাই প্রস্তাবগুলোই কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। এরপর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল-২০১৮’ উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

সম্পূরক বাজেটের আওতায় ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিপরীতে ১৫ হাজার ৩৩৯ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে সর্বাধিক তিন হাজার ৯২৬ কোটি ১১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগ খাতে বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে। এর পরই রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ৩৪৭ কোটি ৪১ লাখ ৬২ হাজার টাকা। সবচেয়ে কম চার  কোটি এক লাখ ৮৭ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন পেয়েছে আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ।

এ ছাড়া বেশি বরাদ্দ পাওয়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ খাতে এক হাজার ৮৬৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগে এক হাজার ১৮২ কোটি ৬৪ লাক ৫০ হাজার টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে জননিরাপত্তা বিভাগে এক হাজার ১০৯ কোটি ১১ লাখ এক হাজার টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৬৫৯ কোটি ৯৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ৪৭১ কোটি ৯৬ লাখ ২১ হাজার টাকা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৩১৫ কোটি ৭৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা, স্থানীয় সরকার পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ খাতে ৩১১ কোটি ৫১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় খাতে ১৯৫ কোটি ৪৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় খাতে ১৭৩ কোটি ৭৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ খাতে ১৬২ কোটি ৬১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।

সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাজেটের বরাদ্দ অর্থ ব্যয় করতে পারেনি তাদের হ্রাসকৃত বরাদ্দের জন্য সংসদের অনুমতির কোনো  প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে কেবলমাত্র তাদের বরাদ্দই সংসদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে  সংসদে এই সম্পূরক বাজেট পাস হয়।

সম্পূরক বাজেটের ওপর মোট ২২টি দাবির বিপরীতে ১৭৩টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনা হয়। ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, মো. ফখরুল ইমাম, নুরুল ইসলাম ওমর, সেলিম উদ্দিন ও রওশন আরা মান্নান এবং স্বতন্ত্র সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমালোচনার পাশাপাশি সম্পুরক বাজেট বরাদ্দ না দেওয়ার দাবি জানান।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগ খাতে সর্বোচ্চ তিন হাজার ৯২৬ কোটি ১১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বরাদ্দের বিরোধিতা করে সংসদ সদস্যরা বলেন, চলতি বছর ৩০ জুনের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কথা। বাকি রয়েছে আর মাত্র কয়েক দিন। ফলে সরকার এটা বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। মন্ত্রী কয়েকটি প্রকল্প চলমান ও কয়েকটি নতুন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এসব প্রকল্প সম্পর্কে আরও বিস্তারিত থাকলে ভালো হতো।

জবাবে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য খরচ হয় হয় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। এবার কিছু টাকা পেয়েছি। আশা করি এ খাতে কিছু গতি সঞ্চার হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে আরো অন্তত কয়েক বছর লাগবে। দেশের জনগণ ও জনগণের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১৬২ কোটি ৬১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপনকালে সংসদ সদস্যরা বলেন, এখন অনেকইে বিদেশে চিকিৎসা সেবা নিতে যাচ্ছেন। নিশ্চয় আমরা তাদের দেশে ধরে রাখার চেষ্টা করবো। এ সময় প্রাইভেট হাসপাতালের অথরিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা। বলেন, কোন কিছু যাচাই-বাছাই না করেই এসব হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এটা খবরদারি ও নজরদারির মধ্যে রাখা উচিত।

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, স্বাস্থ্যখাতে প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে আমরা। কমিউিনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে যে সাফল্য পেয়েছি, তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। তিনি বলেন, খুব শিগগির পাঁচ থেকে ছয় হাজার ডাক্তার নেবো। আশা করি নির্বাচনের আগেই তাদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। তখন আর গ্রামেগঞ্জে ডাক্তার নিয়ে সমস্যা হবে না বলে তিনি দাবি করেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের এক হাজার ৮৬৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের বিরোধিতা করে ছাঁটাই প্রস্তাবকারী এমপিরা বলেন, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপুর্ণ একটি মন্ত্রণালয় এটা। কিন্তু উন্নয়নে সমতা নেই। অনেক অঞ্চলে দেখা যায় ৪-৫টি প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, এসব প্রকল্পের কাজ হয় না। যোগাযোগ করলে বলা হয় হচ্ছে হবে। তারা বলেন, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। অতিরিক্ত যে টাকা নেওয়া হয়েছে তার ব্যয় যেনো সঠিকভাবে হয় সে বিষয়ে মন্ত্রীকে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।

জবাবে এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এটা একটি উন্নয়নমুখী  প্রতিষ্ঠান। এই বিভাগের কাজ দেশব্যাপী অবকাঠামো উন্নয়ন। প্রতিনিয়ত সড়কের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে। সুপেয় পানির জন্যসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার বিভাগ এখনো  আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। দেশের জনগণ ও জনগণের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৪৭১ কোটি ৯৬ লাখ ২১ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যেটা বন্ধ করা যায়নি। অথচ প্রতিবছর এই মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত দেওয়া হয়ে থাকে। এবার অতিরিক্ত বরাদ্দ মঞ্জুর না করার দাবি জানান তারা।

জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক বলেন, সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন। আর এ জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ মোটেও অয্যেক্তিক নয়। তাই আপত্তি প্রত্যাহার করে সম্পূরক বরাদ্দের প্রস্তাব পাসের আহ্বান জানান তিনি।