হালদা নদীতে দূষণে মরছে মাছ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

দেশের কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রজননস্থল চট্টগ্রামের হালদা নদী সম্প্রতি ভয়াবহতম দূষণের শিকার হয়েছে। গত কয়েকদিনে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাজার হাজার মরা মাছ ভেসে উঠছে এই নদীতে। পচে যাওয়া মরা মাছের দুর্গন্ধে দুই পাড়ের বাতাসও দূষিত হয়ে পড়ছে। এতে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য এখন চরম হুমকির সম্মুখীন । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ টিম নদীর ১০টি পয়েন্টে পানির নমুনা পরীক্ষা করেছেন। নমুনা পরীক্ষার পর হালদার ১০টি পয়েন্টেই পানি দূষণের ভয়াবহ চিত্র পেয়েছেন তারা।
স্থানীয়রা জানান, বড় বড় রুই, কাতলা, আইড়, চিংড়ি, বাইন, টেংরাসহ নানা প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠছে হালদায়। হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। তাই উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ছে হালদা পারের মানুষের মধ্য।
হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, বিগত দুই যুগের বেশি সময় ধরে হালদায় কাজ করছি। কিন্তু হালদার পানি এত ভয়াবহ দূষণ হতে দেখিনি।
তিনি বলেন, সাধারণত প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা থাকে ৫ মিলি গ্রাম। কিন্তু হালদার ১০টি পয়েন্টের পানি পরীক্ষী করে পানিতে পাওয়া গেছে ২ মিলি গ্রামের চেয়েও কম। এত কম পরিমাণ অক্সিজেনের মধ্যে মাছ বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে উঠছে। পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে নদীতে।

তবে শনিবার থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন এই হালদা বিশেষজ্ঞ।তিনি বলেন, আমরা নদীর কর্ণফুলীর মুখ, কাটাখালী খালের মুখ, খন্দকিয়া খালের মুখ, মাদারিখালের মুখ, রামদাশ হাট এলাকা, আজিমের ঘাট, নাপিতের ঘোনা, মাছুয়াঘোনা, সর্তার ঘাট এলাকাসহ ১০টি পয়েন্টে পানির নমুনা পরীক্ষা করেছি। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন খুব কম পাওয়া গেছে যা মাছের বসবাসের অনুপুযুক্ত।
এই পানি বিশেষজ্ঞ বলেন, নমুনা পরীক্ষায় নদীর উজানের চেয়ে ভাটি এলাকায় দূষণের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাউজানের আজিমের ঘাট থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত প্রায় ৮কিলোমিটার এলাকায় দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল।

তিন খালের পানি দুষিত হয়ে গত কয়েকদিন ধরে হালদা নদী দুষণের কবলে পড়ে ব্যাপকহারে মাছ মরছে বলে জানান স্থানীয়রা। দুষিত পানির বিষাক্ততায় শুধু মাছ নয়, মরছে হালদার অন্যান্য জীবও। গত ৩-৪ দিনে এই দূষণজনিত মড়কের শিকার হয়েছে ১৫-২০ কেজি ওজনের রুই কাতাল মাছসহ নদীর অন্যান্য প্রজাতির মাছও। মোড়কের শিকার মাছের মধ্যে রয়েছে হালদার গলদা চিংড়ি, ট্যাংরা, বাইম, আইড়। স্থানীয়রা ভেসে উঠা মরা মাছগুলোকে মাটি চাপা দিয়ে আপাততঃ বাতাসের দূষণ ঠেকাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিনে ভারী বর্ষণ ওপাহাড়ি ঢলে রাউজান, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পানি নামার পর কয়েকদিন ধরে হালদার মাছ মরে ভেসে ওঠার বিষয়টি নজরে পড়ে মানুষের। নদীর পানি কালো রং ধারণ এবং দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। নদী দূষণ ও মাছ মরে যাওয়ার কারণ নির্ণয়ের জন্য শনিবার মাঠে নামে বিশেষজ্ঞ টিম। তাদের পরীক্ষায় নদীর পানি দূষণের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে।