সাবজানের ভিটাকে ওরা বানাল ফসলি জমি!

মোস্তাফিজুর রহমান, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)
২২ বছর ধরে আইনি লড়াই শেষে ফিরে পাওয়া জমিতে ঘর তুলেছিলেন অশীতিপর সাবজান। কিন্তু রাতের অন্ধকারে দখলদাররা গুঁড়িয়ে দিয়েছে তার সেই ঘর। ভিটাবাড়ি নিশানা মুছে দেওয়ার জন্য লাঙল দিয়ে বানানো হয়েছে ফসলি জমি।

বৃদ্ধা সাবজানের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায়। উপজেলার জাটিয়া ইউনিয়নের টাঙ্গনগাতি গ্রামের মৃত রহিম বকসের স্ত্রী মোছা. সাবজান। তার আবদুর রাশিদ ও আবদুর রশিদ নামে দুই ছেলে এবং সাহেরা খাতুন ও রুমেলা খাতুন নামে দুটি মেয়ে রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের পর সাবজানের স্বামী মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং গ্রাম ছেড়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে মারা যান। স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে আর ভিটেতে ফিরতে পারেননি সাবজান। সাবজানের স্বামীর চাচাতো ভাইয়েরা তার জমিজমা বিক্রি করে দেন। ওই অবস্থায় নিজে অন্যের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের বড় করে তোলেন। পরে বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করে ১৯৯৬ সালে ঈশ্বরগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে আট একর ৮১ শতক জমির জন্য মামলা করেন সাবজান। মামলায় রুহুল আমিনসহ বেশ কয়েকজনকে প্রতিপক্ষ করা হয়। আদালত বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১২ সালের শুরুর দিকে বৃদ্ধার পক্ষে একটি রায় প্রকাশ করেন। এর পরও বৃদ্ধা তার জমি ফেরত না পাওয়ায় ২০১৭ সালের আগস্টে বৃদ্ধার ওই জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ময়মনসিংহ পুলিশ সুপারকে একটি চিঠি দেন বিচারক। আদালতের নির্দেশে পুলিশের উপস্থিতিতে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পুলিশ, আদালতের কোর্ট কমিশনার, জারিকারকসহ ভূমি কর্মকর্তা বৃদ্ধাকে দুই দশমিক ৩৫ একর জমি বুঝিয়ে দেন।

সেই জমিতে সাবজান ঘর তুলতে গেলে বাধা দেওয়া হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে নিজ ভিটাতে ঘর তোলেন তিনি। তখন থেকেই সাবজানকে ভিটাছাড়া করতে ষড়যন্ত্র শুরু করে প্রতিপক্ষের লোকজন। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই গত ১০ এপ্রিল ময়মনসিংহ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে সাবজানের জমির ওপর ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করেন জনৈক মো. নুরুল ইসলাম। আদালত থেকে গত ১২ এপ্রিল আদেশনামা পাওয়ার পর ১৩ এপ্রিল বিকেলে ঘটনাস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করতে যান ঈশ্বরগঞ্জ থানার এএসআই আবদুল হান্নান। কিন্তু এর আগেই ১২ এপ্রিল রাতে সাবজানের জমিতে থাকা বসতঘর, রান্নাঘরসহ চারটি ঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে ফসলি জমির মতো হালচাষ করে ফেলা হয়। সাবজানকে ভিটাছাড়া করার পর দিন ১৪৪ ধারার আদেশ যায় এলাকায় এবং আদেশটিতে বলা আছে দখল অক্ষুণ্ণ রেখে ওই জমি নিয়ে যেন কোনো শান্তিভঙ্গের কারণ না ঘটে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে।

বৃদ্ধা সাবজানের অমানবিক এমন ঘটনার খবর পেয়ে গত শুক্রবার বিকেলে এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধা তার ভিটার জমিতে বসে আহাজারি করছেন। ঘরগুলো নিশ্চি??হ্ন করে দেওয়া হয়েছে। গৃহস্থালির কোনো জিনিস অবশিষ্ট রাখা হয়নি। সাবজান বলেন, অনেক লড়াই করে কিছু জমি পেলেও তা দখল করে নিয়েছে গ্রামের লোকজন।

সাবজানের ঘরগুলো নিশ্চি?হ্ন করার পেছনে গ্রামের বেশ কিছু প্রভাবশালী লোক জড়িত। তাই প্রকাশ্যে তার পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। দখলদারদের কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও তাদের এক সহযোগী স্বপন মিয়া বেশ দম্ভোক্তি করে বলেন, ‘ওই বেডির (মহিলার) এইখানে কোনো জমি নাই।’ সাবজান যে আট একর ৮১ শতক জমির মালিকানা দাবি করছেন, তার কিছু তার দখলেও রয়েছে বলে স্বীকার করেন এই স্বপন মিয়া। তার দাবি, জমি তাদের, আদালত ভুল করে এখানে সাবজানকে জমি বুঝিয়ে দিয়েছেন।

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বদরুল আলম খান বলেন, আদালতের নির্দেশে বৃদ্ধাকে জমিটুকু বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন বৃদ্ধার জমিতে থাকা ঘরগুলো নিশ্চি?হ্ন করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে থানায় একটি মামলা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে।