সাঈদীর জন্য ডিভিশন চেয়ে রিট খারিজ

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জন্য কারাগারে ডিভিশন চেয়ে করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট।সাঈদীর ছেলের করা ওই আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাই কোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার (২৮জুন) এ আদেশ দেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের নায়েবে আমির সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও আপিলে তার সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় সর্বোচ্চ আদালত।
ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তিন হাজারের বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, অন্তত নয়জন নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর এবং এক থেকে দেড়শ হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার মত ২০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে একাত্তরে জামায়াত নেতা সাঈদীকে তার জেলা পিরোজপুরের মানুষ চিনত ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামে। তিনি যে রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় অংশ নিয়েছেন, তা উঠে এসেছে ওই মামলার বিচারে।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করলেও পরে জিয়াউর রহমানের সময় রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়ে দুইবার সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। কারাগারে তার ডিভিশন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশনা চেয়ে গত রোববার হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন তার বড় ছেলে শামীম সাঈদী।রিট আবেদনের পক্ষে আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দুই দিন এ বিষয়ে আদালতে শুনানি করেন। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তানভীর আহমেদ আল আমীন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

বৃহস্পতিবার রিট খারিজ হওয়ার পর আইনজীবী তানভীর গণমাধ্যমকে বলেন, “দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী উচ্চমাত্রার রক্তচাপ, উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে ভুগছেন। সম্প্রতি তাকে চিকিৎসার জন্য কারা কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে আসে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য বললেও কারা কর্তৃপক্ষ তাকে কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।”

এই আইনজীবী বলেন, “জেলকোড অনুযায়ী তিনি ডিভিশন-২ পান। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল বলছেন, সংবিধানের ৪৭ (২) ও (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে যুদ্ধাপরাধীদের রিট চলতে পারে না। সংবিধানে এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাধা থাকার কারণে রিটটি গ্রহণযোগ্য নয়। পরে রিটটি খারিজ করা হয়েছে।”

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৭ ক এর (২) দফায় বলা হয়েছে, “এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইন প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোনো প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করিবার কোনো অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।”

আর অনুচ্ছেদ ৪৭ এর (৩) দফায় বলা হয়েছে, “এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোনো সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য [ বা অন্য কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তি সমষ্টি বা সংগঠন] কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান-সংবলিত কোনো আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোনো বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা তাহার পরিপন্থি, এই কারণে বাতিল বা বেআইনি বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনি হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।]

উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। এরপর সাঈদী আপিল করলে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দেন। তাতে সাজা কমে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ হলে রিভিউ করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর পাঁচদিনের মাথায় খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন সাঈদী।