মিথ্যা কেন বলে

* মিথ্যা বলা শিশুদের সাধারণ সমস্যা। শিশুরা কল্পনাপ্রবণ হয় এবং চার বা পাঁচ বছর বয়সের আগে শিশু সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে না।

তাই কল্পনার বশবর্তী হয়ে মিথ্যা বলতে পারে কিংবা যেকোনো ঘটনাকে একটু বাড়িয়ে বা অতিরঞ্জিত করে বলতে পারে।
* বকা বা শাস্তির ভয়ে কিংবা শুধু আত্মগ্লানি থেকে নিজের ভুল-ত্রুটি আড়াল করতে শিশু মিথ্যা বলতে পারে। অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যও শিশুরা মিথ্যা বলতে পারে। ব্যথা না পেয়েও ব্যথা পেয়েছি বলা কিংবা আদৌ ঘটেনি এমন কিছু বলে শিশুরা কাছের মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়।

* সমবয়সীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা বা তাদের সঙ্গে বাহাদুরি দেখানোর জন্যও মিথ্যা বলতে পারে। অতৃপ্ত ইচ্ছা পূরণের জন্যও শিশু মিথ্যা বলে। যেমন—কোনো জিনিস যেটা তার নেই, কিন্তু বলছে এটা তারও আছে অথবা কালকেই আব্বু বা আম্মু এনে দেবে। অবচেতন মনের পাওয়ার ইচ্ছা মিথ্যা বলার কারণ হতে পারে।

* শিশুদের চারপাশ দেখে শেখার প্রবণতা খুব বেশি থাকে।

তাই অনেক সময় বড়দের মিথ্যা বলতে দেখেও শিশুরা মিথ্যা বলা শেখে। বড়রা শিশুর সামনে হয়তো এক রকম বলছেন, কাজের বেলায় অন্য রকম করছেন। শিশুর মন ভোলাতেও বড়রা অনেক সময় মিথ্যার আশ্রয় নেন।
করণীয় কী

* রূপকথা, উপকথার এমন গল্পগুলো শিশুদের শোনান, যেখান থেকে ওরা ভালো কিছু শিখতে পারে। যাতে ভালো কাজ আর মন্দ কাজ সম্পর্কে ওরা বুঝতে পারে। মিথ্যা কথা মানুষের জন্য কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে সে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন।

* একটা বয়সের পর গল্পের ব্যাখ্যা করে ওদের বাস্তব আর কল্পকাহিনির তফাত বুঝিয়ে দিন।

* কল্পনাজনিত মিথ্যার অভ্যাস বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়। তবু খুব ছোটবেলা থেকেই শিশুকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সত্য বলার শিক্ষা দিতে হবে। কল্পনা আর মিথ্যার মধ্যে তফাতটা ধরিয়ে দিন। কল্পজগত্ ও বাস্তবতা এক নয়, এটা গল্পচ্ছলে শেখাতে হবে। ঈশপের গল্প বা বিভিন্ন নৈতিক গল্প শুনিয়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝানোর চেষ্টা করুন। সত্য বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করুন। সত্য বলার জন্য শিশুকে পুরস্কৃত করুন।

* ছেলেবেলা চঞ্চলতা আর দুষ্টুমির বয়স, নষ্ট করে শেখার বয়স। শিশুকে বুঝিয়ে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় শেখাতে হবে। কোনো কিছুতেই চাপ প্রয়োগ, রাগ বা মারধর করা ঠিক নয়। শিশুকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করতে উত্সাহিত করুন। যতটুকু পেরেছে তার জন্য প্রশংসা করুন। না পারলেও অনুপ্রাণিত করুন। তাহলে অপরাধ বোধ বা আত্মগ্লানি থেকে শিশুর মিথ্যা বলার অভ্যাস তৈরি হবে না।

* শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তাই শিশুর সামনে কথা বলার সময় পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে। শিশুর মন ভোলাতে কিংবা খেলাচ্ছলেও মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, পারিবারিক পরিবেশ শিশুর অনুকূলে থাকে এবং মা-বাবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে শিশু তার অবস্থান ব্যক্ত করার সুয়োগ পায়। নিরাপদ বোধ করে এবং শিশুকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় না। মাত্রাতিরিক্ত আদর বা শাসন কোনোটাই শিশুর জন্য সঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে বড়দের ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখাতে হবে। কঠোর হয়ে বা শাস্তি দিয়ে মিথ্যাকে রোধ করা যাবে না। শিশুর জন্য আদর ও শাসন—দুই-ই থাকবে কিন্তু কোনোটিই মাত্রাতিরিক্ত নয়। সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করুন।

* এর পরও শিশুর মিথ্যা বলার প্রবণতা থাকলে সময় নিয়ে শিশুর কাছে জানতে চান কী কারণে সে মিথ্যা বলছে। সত্য কথা বললে ওর কী সমস্যা হতো, ইত্যাদি। কথা বলে ওর মানসিক অবস্থাটা বুঝে সে অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে একজন শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ কাউন্সিলরের সাহায্য নিতে পারেন।