লক্ষ্য এবার হাজার কোটি

লোহালক্কড়ের দোকানের সামনে মানুষের ভিড় ঠেলে বাবুবাজার ব্রিজে উঠতেই যানজট। বৃষ্টিতে সেই যানজট আরও প্যাঁচালো। এসব পেরিয়ে কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগরে পৌঁছতেই দেখা গেল ভিড় আর ব্যস্ততা সবখানে। এখানকার ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিনিধিরা আশা করছেন, এমন ভিড় থাকবে আগামী ২৫ রমজান অবধি। এবার এ পোশাকপল্লীর বিক্রি ছাড়িয়ে যাবে এক হাজার কোটি টাকার ঘর।

গতকাল সোমবার কেরানীগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল মুন্সীগঞ্জের পারভেজ হোসেনের সঙ্গে। নিজের এলাকায় পোশাকের ছোটখাটো দোকান তার। পারভেজ জানান, পাইকারি পোশাক কেনার জন্য কেরানীগঞ্জই তার ভরসা। কারণ, এখানে স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের পোশাক পাওয়া যায়। একই কথা বললেন দোহারের মো. আনোয়ার। শবেবরাতের আগেও একবার এসে এখান থেকে পণ্য নিয়ে গেছেন তিনি। কেরানীগঞ্জ তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও স্বল্পমূল্যের মানুষের ভরসার স্থল এ মার্কেট। তাদের দাবি, দেশের পোশাকের চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই কেরানীগঞ্জ থেকে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় এই পোশাকের মান ভালো হওয়ায় প্রতি বছরই এর চাহিদা বাড়ছে।

তবে কেরানীগঞ্জে ঠিক কতটি তৈরি পোশাক কারখানা ও বিপণিবিতান এবং দোকান আছে, সে সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতিও এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে প্রায় পাঁচ হাজার তৈরি পোশাকের কারখানা রয়েছে। আর বিপণিবিতানের সংখ্যা শ’দুয়েক। এতে দোকান রয়েছে হাজার তিনেক। আবার অনেকের মতে, এখানে তৈরি পোশাকের কারখানা ছয় থেকে সাত হাজার, আর দোকানের সংখ্যা নয় থেকে দশ হাজারের মধ্যে। এগুলোতে দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঘটেছে বলে জানান তারা।

কেরানীগঞ্জের জিলা পরিষদ মার্কেট, এস আলম সুপার মার্কেট, তানাকা মার্কেট, হাজী আনোয়ার কমপ্লেক্স, নূর সুপার মার্কেট, চৌধুরী মার্কেট, ইসলাম প্লাজা, আলম সুপার মার্কেট, আনোয়ার সুপার মার্কেট, কদমতলী গোলচত্বর এলাকার লায়ন সুপার মার্কেট ও জিঞ্জিরার ফ্যামিলি শপিং মলের ব্যবসায়ীরা জানালেন, পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, শিশুদের কাপড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পোশাক পাওয়া যায় এখানে। এর মধ্যে জিন্স ও গ্যাবার্ডিন প্যান্ট এবং পাঞ্জাবির জন্য কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টপল্লীর সুনাম বেশি। এখানে দুইশ’ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার মধ্যে ছোট ও বড়দের জিন্স প্যান্ট পাওয়া যায়। তবে চাহিদা বেশি তরুণদের ৪০০-৬০০ টাকার জিন্স প্যান্টের। এ ছাড়াও এখানে ১৫০-৩০০ টাকার মধ্যে ফতুয়া, ২০০-৬০০ টাকার মধ্যে পাঞ্জাবি, ১৫০-৫০০ টাকার মধ্যে শার্ট, ২০০-৪০০ টাকার মধ্যে বাচ্চাদের পোশাক, ৩০০-৮০০ টাকার মধ্যে মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ পাইকারি হিসেবে বিক্রি হয়। তাই ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা ছাড়াও সারাদেশের খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানে পাইকারি দরে পোশাক কিনতে আসেন। বারো মাস কম-বেশি ব্যবসা হলেও এখানকার সারা বছরের ব্যবসার ৬০-৭০ শতাংশই রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে।

জিলা পরিষদ মার্কেটের আল-আমিন প্লাসের স্বত্বাধিকারী জালাল আহমেদ জানান, এবারের বিক্রিও ভালো। শবেবরাতের এক সপ্তাহ আগে থেকেই তারা বিক্রি শুরু করেছেন। দূরের জেলার ক্রেতারাই বেশি কিনছেন।

তবে বিক্রি নিয়ে খুব একটা খুশি নন মাস্টার অ্যাপারেলের স্বত্বাধিকারী মো. শামীম হোসেন। তিনি বলেন, এ বাজারে এখন চায়না পণ্য ঢুকেছে। রফতানি পণ্য উৎপাদকরাও ঢুকে গেছে। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়ছেন।

হাজী আনোয়ার কমপ্লেক্সের মুক্তা বেবি ফ্যাশনের ব্যবস্থাপক বাবুল হোসেন জানান, রোজার শুরুতে বৃষ্টিতে বেচা-বিক্রিতে ভাটা পড়েছিল। তবে শবেবরাতের পর থেকে বিক্রি খুবই ভালো। একই রকম সন্তোষ প্রকাশ করলেন তাজমহল পাঞ্জাবির স্বত্বাধিকারী লাবলু সরদার।

তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতেও এখনও চলছে বিরামহীন কাজ। মোস্তাক গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বলেন, শবেবরাতের মাসখানেক আগে থেকেই এখানে পণ্য উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে; যা এখনও চলছে। গত বছরের তুলনায় এবারের বিক্রি ভালো বলে মনে করেন তিনি।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি শেখ আবদুল শেখ ও সাধারণ সম্পাদক স্বাধীন শেখ বলেন, দেশে এখনও স্বল্প আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। তাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখেই কেরানীগঞ্জের পল্লীতে পোশাক তৈরি করা হয়। এখানকার পোশাকের চাহিদা সব সময়ই বেশি। তবে শীত ও ঈদ মৌসুমই ব্যবসার সবচেয়ে বড় মৌসুম। গত বছরের তুলনায় এবারের বিক্রি বেশি। আশা করা যাচ্ছে, এবারের বিক্রি এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সমিতির উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় বলে জানান তারা।