রক্ত দিলে শারীরিক কোন ক্ষতি হয় কি?

অভিজিৎ পাল (সাভার থেকে) : আমাদের আশেপাশে খেয়াল করলেই দেখতে পাব, প্রতিদিনই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগীর রক্তের অভাব দেখা দিচ্ছে এবং রক্তের অভাবে রোগীর মৃত্যুর কথাও অস্বাভাবিক নয় । কিন্তু, দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অকল্পনীয় উন্নতি সাধনের পরেও কৃত্রিমভাবে রক্ত উৎপাদন করা এখনো কল্পনাতেই রয়ে গেছে অর্থাৎ রক্ত এমন এক জীবনদায়ি উপাদান, যা প্রয়োজনের সময় আপনি পাশের কোন ফার্মেসিতে গিয়ে কিনে আনতে পারবেন না ।অতএব একজন মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে বাঁচাতে হলে একজন রক্তদাতাকেই এগিয়ে আসতে হবে ।

তারমানে কিন্তু এই নয়, যে শুধুমাত্র পেশাদার রক্তদাতারাই এ কাজ করতে পারবে ।আপনিও চাইলে স্বেচ্ছায় রক্তদান করতে পারেন ।

চলুন জেনে নেয়া যাক রক্তদান সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নেয়া যাক ।

কারা রক্ত দানের জন্য উপযুক্তঃ

১৮-৬০ বছরের সুস্থ সবল যে কোন ব্যাক্তির ওজন যদি ন্যুনতম ৪৮ কেজি হয় তবে তিনি রক্ত দানের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হন।

 

রক্ত দিলে শারীরিক কোন ক্ষতি হয় কি?

রক্তদানে শরীরের কোন ক্ষতি হয়না। ছেলেদের শরীরে ওজনের কেজিপ্রতি ৭৬ মিলিলিটার আর মেয়েদের শরীরে ওজনের ৬৬ মিলিলিটার করে রক্ত থাকে এবং সবারই কেজিপ্রতি ৫০ মিলিলিটার রক্ত সংবহনের জন্য প্রয়োজন হয়, বাকিটা থাকে উদ্বৃত্ত। অর্থাৎ ছেলেদের ওজনের কেজিপ্রতি ২৬ মিলিলিটার আর মেয়েদের ওজনের কেজিপ্রতি ১৬ মিলিলিটার রক্ত থাকে উদ্বৃত্ত। ফলে ৫০ কেজি ওজনের একটি ছেলের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ৫০x২৬=১৩০০ মিলিলিটার আর একই ওজনের একজন মেয়ের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ৫০x১৬=৮০০ মিলিলিটার । আর স্বেচ্ছা রক্তদানে একজন রক্ত দাতার কাছ থেকে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করা হয়। তাই রক্তদানে শারীরিক কোন ক্ষতি হবার সম্ভাবনাই নেই। আর একজন সুস্থ লোক প্রতি চারমাস পরপর রক্ত দান করতে পারেন। মানুষের শরীররে রক্ত উপাদান গুলি প্রতি চার মাস পর এমনিতেই নষ্ট হয়ে নতুন রক্ত উৎপাদিত হয়। তাই রক্ত দান করলে শরীরের ক্ষতি তো হয়ইনা বরং আছে অনেক উপকার।
স্বেচ্ছা রক্ত দানের মানসিক ভাবেও আছে অনেক উপকার এবং ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত পুন্যের।

 

শারীরিক উপকারিতাঃ

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল এটাই যে রক্ত নিয়মিত রক্ত দান স্বাস্থের জন্যে শুধু উপকারিই নয় বরং নিয়মিত রক্ত দিলে একজন মানুষ মুক্ত থাকতে পারেন বেশ কয়েকটি মারাত্মক রোগের ঝুঁকি থেকে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমেঃ

মিলার-কিস্টোন ব্লাড সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা যায় নিয়মিত রক্ত দিলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। বিশেষ করে ফুসফুস, লিভার, কোলন, পাকস্থলী ও গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি নিয়মিত রক্ত দাতাদের ক্ষেত্রে অন্যান্য দের চেয়ে অনেক কম থাকে।

 

হৃদরোগ এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমেঃ

নিয়মিত রক্তদানে হৃদযন্ত্রের সামগ্রিক উন্নতি হয়। রক্তে যদি লৌহের পরিমাণ বেশি থাকে তাহলে তাহলে কোলেস্টেরলের অক্সিডেশনের পরিমাণ বেড়ে যায়, ধমনী ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ফলাফল হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত রক্ত দিলে দেহে লৌহের পরিমাণ কমে যায় যা, হৃদ রোগের ঝুঁকিকেও কমিয়ে দেয় কার্যকর ভাবে।
যারা নিয়মিত রক্তদেন তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৮৮ ভাগ কমে যায় এবং স্ট্রোক সহ অন্যান্য হৃদ রোগের ঝুঁকি কমে যায় ৩৩ ভাগ।

 

প্রাণবন্ততা এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিঃ

রক্ত দান করার সাথে সাথে আমাদের শরীরের ব্যোন ম্যারো নতুন কনিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয়। রক্ত দান করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেহে রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর লোহিত কনিকার ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় ৪ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যেই। আর এই প্রক্রিয়া আমাদের শরীরের সার্বিক সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা কেই বাড়িয়ে দেয়।

 

অতিরিক্ত ক্যালরি ক্ষয়ঃ

নিয়মিত রক্তদানে শারীরিক ফিটনেস বাড়ে। ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত দান করলে রক্ত দাতার দেহ থেকে ৬৫০ ক্যালরি পুড়ে। তাতে রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে এবং ডায়বেটিসের ঝুঁকি কমে যায়।
এছাড়াও নিয়মিত রক্ত দান করলে কোন দুরারোগ্য ব্যাধি শরীরে দানা বাঁধতে পারে না তাই উচ্চরক্তচাপ সহ যে কোন কঠিন রোগ থেকে থাকা যায় নিরাপদ।

 

নিজের সুস্থতা পরীক্ষাঃ

রক্ত দান করার মাধ্যমে একজন রক্ত দাতা তার সার্বিক সুস্থটাকে যাচাই করে নিতে পারেন । হেপাটাইটিস বি, সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া এবং এইডস এই পাঁচটি রোগের স্ক্রিনিং রিপোর্ট পাওয়া যাবে বিনামুল্যে যা করতে যে কোন সাধারণ মানের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কমপক্ষে কয়েক হাজার টাকা খরচ হবে। এভাবে বছরে তিনবার রক্তদান আপনার সার্বিক সুস্থতার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

 

রক্ত শারীরিক উপকার ছাড়াও আছে মানসিক উপকার ও অত্যন্ত পুন্যের কাজ

 

চারজন রোগীর জীবন দানঃ

রক্তের অপরিহার্য চারটি উপাদান হচ্ছে লোহিত কনিকা, শ্বেতকনিকা ,অণুচক্রিকা ও প্ল্যাটিলেট। একজন রক্তদাতার দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহের পর এই চারটি উপাদান পৃথক করে চারজন রোগীকে প্রদানের মাধ্যমে চারজন রোগীর প্রান রক্ষা করা হয়।

 

অত্যন্ত পুন্যের কাজঃ

রক্ত দান ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত পুন্য বা সওয়াবের । পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে “ যে ব্যাক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল সে যেন সমগ্র মানব জাতির জীবন রক্ষা করল” ( সূরা মায়েদাঃ ৩২)।                   মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন একজন খারাপ মহিলাকে শুধুমাত্র পিপাসারত মৃত্যু পথযাত্রী কুকুরকে পানি পান করানোর মাধ্যমে প্রান রক্ষা করার জন্য ক্ষমা ও জান্নাত দান করতে পারে তবে, রক্তদানের মাধ্যমে চারজন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য আপনাকে আমাকে আরো বড় পুরস্কার অবশ্যই দিতে পারেন ।

 

রক্তদানের এত উপকারীতা থাকা স্বত্তেও বিশেষ করে আমাদের দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা খুবই কম । আজকাল অনেক ছাত্রছাত্রীরা একত্রিত হয়ে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা খুঁজে দেবার কাজ করে থাকে । তাদের সাথে কথা বলে যা জানতে পারি তা হল, জনগণ বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এখনো রক্তদান সম্পর্কে নানারকম ভুল ধারনা বিরাজ করছে ,যার ফলে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পথে একটি বড় বাঁধা । এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে আমাদের, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদেরকে সমস্ত ভুল ধারণা থেকে বেড়িয়ে, স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসতে হবে ।