মিলে কমেছে চালের দাম

অবশেষে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। মিল পর্যায়ে সব ধরনের চালে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত কমেছে। দাম কমেছে পাইকারি বাজারেও। তবে মিল ও পাইকারি বাজারে চালের দাম কমার প্রভাব পড়েনি খুচরা পর্যায়ে। ফলে স্বস্তি ফেরেনি ভোক্তাদের মাঝে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চালের আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানিতে উত্সাহিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে চাল আমদানি শুরু হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। মিলে চালের দাম কমলে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়তে দু’একদিন সময় লাগবে। আগামি এক সপ্তাহের মধ্যে চালের বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

এবার হাওর অঞ্চলে অকাল বন্যা ও ব্লাস্ট রোগে বোরোর আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। এতে সারাদেশে চালের দাম বাড়তে শুরু করে। গত বছর যে মোটা চালের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩২ টাকা তা বাড়তে বাড়তে ৫০ টাকায় পৌঁছায়। এছাড়া পাইজাম/লতা ৫০ থেকে ৫২ ও নাজিরশাইল/মিনিকেট ৫৮ থেকে ৬২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। ফলে ভোগান্তিতে পড়ে ভোক্তারা। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ।

এদিকে সরকারের মজুদ তলানিতে নেমে যাওয়ায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ীও এর সুযোগ নেয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যেখানে সরকারের গুদামে চালের মজুদ ছিল ৬ লাখ ৯৬ হাজার টন সেখানে বর্তমানে চালের মজুদ ১ লক্ষ ৯১ হাজার টন। ফলে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত চাল না থাকায় ওএমএসের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। চালের দাম বেড়েছে লাগামছাড়া।

এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানিতে সরকার উত্সাহিত করতে সম্প্রতি আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে।

চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারিভাবে চাল আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান বলেন, প্রাথমিকভাবে ৬ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে ঘাটতি পূরণে আমদানির পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ লাখ টনে বাড়তে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে ভিয়েতনাম থেকে আড়াই লাখ টন চাল আসছে। প্রতি টন চালের দাম পড়েছে ৪৩০ থেকে ৪৭০ ডলার। এই চাল আসলে বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, আরো দেড় লাখ টন চাল আমদানির জন্য সরকার টেন্ডার আহ্বান করেছে। এছাড়া আগামীকাল বুধবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল চাল আমদানির ব্যাপারে আলোচনার জন্য থাইল্যান্ড যাচ্ছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর কাওরান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষিবাজারসহ কয়েকটি পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, গুটি, স্বর্ণা, মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের দাম কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তবে চালের দাম সবচেয়ে বেশি কমেছে মিল পর্যায়ে। মিলে সব ধরনের চাল কেজিতে কমেছে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে চালের দাম আরো কমবে বলে মিলাররা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়ের আলী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বেসরকারিভাবে চাল আমদানি শুরু হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বাজারে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। মিল পর্যায়ে সব ধরনের চাল কেজিতে ৩/৪ টাকা পর্যন্ত কমেছে। দাম আরো কমবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো কোনো মিলে দুইদিন ধরে চাল বিক্রি নেই। দাম আরো কমার সম্ভাবনায় চালের পাইকারি ক্রেতা নেই। তিনি বলেন, এক দিনের ব্যবধানে মিনিকেট প্রতি বস্তায় ( ৫০ কেজি) ২’শ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪’শ টাকায়। আমদানি করা মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূলত হাওরের অকাল বন্যার ফলেই চালের দাম বাড়তে শুরু করে। এখানে মিলারদের কোনো কারসাজি নেই।

এদিকে মিল ও পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম কমতে শুরু করলেও এখানো প্রভাব পড়েনি খুচরা বাজারে। রাজধানীর কাওরান বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী ফারুক বলেন, আমরা এখন যে চাল বিক্রি করছি তা আগের কেনা। ফলে তা বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এখন কম দামে চাল কিনলে তা কমে বিক্রি করব।

মোহাম্মদপুর কৃষি বাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী তিতাস রাইস এজেন্সির মো: আব্দুল মতিন গতকাল বলেন, মিলে দাম কমায় পাইকারি বাজারেও কমতে শুরু করেছে চালের দাম। খুচরা বাজারে দাম কমার প্রভাব পড়তে দু’একদিন সময় লাগবে।

চট্টগ্রামে বস্তাপ্রতি কমেছে ২০০ টাকা

চট্টগ্রাম অফিস থেকে মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামে পাইকারি বাজারে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। গতকাল বাজারে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমেছে। তবে খুচরা বাজারে এখনো চালের দাম আগের মত।

চট্টগ্রামে চালের দু’টি প্রধান পাইকারি বাজার হচ্ছে পাহাড়তলী ও চাক্তাই এলাকায় জিরাশাইল মিনিকেট, স্বর্ণা, পাইজাম, বাসমতি চালের দাম নিম্নমুখী। পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এসএম নিজাম উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেওয়ায় মায়ানমার ও ভারত থেকে প্রচুর চাল আমদানি হচ্ছে। এতে পাইকারি বাজারে বস্তা প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরো কমবে।’

আমদানিকারক আবদুস ছালাম বলেন, ‘আমি ৫ হাজার টন চাল আমদানির জন্য এলসি করেছি। কিছু চাল বন্দরে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু বন্দরে চাল খালাসে প্রশাসনিক দীর্ঘ সূত্রিতায় চাল বাজারে আসতে বিলম্ব হচ্ছে। চালের বাজার স্বাভাবিক করতে চাল খালাসে প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।