নোমান মাহমুদঃ সারাদেশে প্রতারকদের দৌরাত্ম দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। অন্যান্য পেশার পাশাপাশি বর্তমানে চিকিৎসা পেশাও আক্রান্ত এই প্রতারকদের খপ্পরে। সাধারন রোগী ও তাদের স্বজনদের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেনীর অসাধু ব্যক্তিরা ভিন্ন পেশা থেকে এসে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে নিজেরাই বনে যাচ্ছেন ডাক্তার। কেউবা শুধুমাত্র মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট কোর্স কিংবা পল্লি চিকিৎসার কোর্স করেই নামের আগে ’ডাঃ’ আর বাহারী সাইনবোর্ডে এম.বি.বি.এস, এফ.সি.পি.এইচ কখনোবা নাক-কান-গলা, শিশু রোগ, চর্ম ও যৌন রোগসহ বিভিন্ন রোগের বিশেষজ্ঞ বলে নিজেদের পরিচয় দিয়ে রোগীদের সাথে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে চলেছে। যার কারনে সাধারন রোগীদের বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুকি তৈরী হওয়াসহ মানব সেবায় নিয়োজিত মূলধারার চিকিৎসকদের পড়তে হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে। যদিও বর্তমানে মূলধারার চিকিৎসকগণ তাদের পেশাগত ভাবমূর্তি রক্ষায় অনেকটাই সোচ্চার। এছাড়া ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম ঠেকাতে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) পক্ষ থেকে তাদের ওয়েবসাইটে সকল রেজিষ্টার্ড চিকিৎসকদের রেজিঃ নাম্বারসহ চিকিৎসকের ছবি, নাম, পরিচয় সংরক্ষন করা হয়েছে। সেই সাথে দেশের সকল রেজিষ্টার্ড চিকিৎসকদের তাদের নিজস্ব প্যাড, ভিজিটিং কার্ড ও সাইনবোর্ডে তাদের বিএমডিসি’র রেজিঃ নাম্বার স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যার মূল লক্ষ সাধারন রোগীরা যেন রেজিঃ নাম্বার যাচাই করে আসল চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা গ্রহন করে প্রতারকদের হাত থেকে বাঁচতে পারে। কিন্ত নির্দেশনা থাকলেও অনেক চিকিৎসক তা না মানার কারনে প্রতারকরা সেই সুযোগ নিয়ে চিকিৎসক সেজে দিব্বি তাদের প্রতারণা অব্যাহত রেখেছে। আর সাধারন দৃষ্টিতে এসকল প্রতারকদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে তারা চিকিৎসক নাকি চিকিৎসকের বেশে কসাই।

সম্প্রতি ঢাকার পার্শ্ববর্তী উপজেলা সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত আপন জেনারেল হাসপাতাল নামে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে খোজ মেলে এমনই এক প্রতারকের। ইব্রাহীম খলিল নামে সেই ব্যক্তির সম্পর্কে খোজ নিয়ে দেখা যায় দীঘদিন যাবত আপন জেনারেল হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে চিকিৎসক না হয়েও নামের আগে ’ডাঃ’ আর নিজেকে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ দাবী করে দীর্ঘদিন যাবত রোগীদের সাথে প্রতারনা করে চলেছে এই ব্যক্তি।

সরেজমিনে ঐ ক্লিনিকে গিয়ে ইব্রাহীম খলিলের দেখা না মিললেও হাসপাতালের সাইনবোর্ড ও আশেপাশের কয়েকটি ফার্মেসীতে লাগানো ব্যানারে দেখা যায় বড় অক্ষরে লেখা ”নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ”। এছাড়াও এম.বি.বি.এস সহ নামের পাশে লাগিয়ে রেখেছেন প্রায় ৬/৭ টি ডিগ্রি। এবিষয়ে মুঠোফোনে ইব্রাহীম খলিলের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ”সাইনবোর্ডে বিশেষজ্ঞ লেখাটা ভুল। আমি কোন বিশেষজ্ঞ না”। তার জবাবে প্রতিবেদক পাল্টা প্রশ্নে তিনি চিকিৎসক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ”আমি বিশেষজ্ঞ না তবে চিকিৎসক”। নিজেকে চিকিৎসক বলে দাবী করার পর প্রতিবেদক বারবার তার কাছে তার বিএমডিসি’র (বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) রেজিঃ নাম্বার জানতে চাইলে তিনি তা জানাতে ব্যার্থ হন। এক পর্যায়ে মুঠোফোনে ইব্রাহীম খলিল নামক ঐ ব্যাক্তি প্রতিবেদককে তার চেম্বারে গিয়ে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। প্রতিবেদককে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হয়ে মুঠোফোনে বিভিন্ন ব্যক্তি দিয়ে প্রতিবেদককে হুমকিও প্রদান করে এই ব্যক্তি। পরবর্তীতে এই প্রসঙ্গে কথা বলতে আপন জেনারেল হাসপাতাল নামক ঐ প্রাইভেট ক্লিনিকের মালিকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এবিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে কথা বললে তারা আওয়ার নিউজ ২৪ ডটকম’ কে বলেন, ”যেসকল হাসপাতাল-ক্লিনিক ভুয়া ডাক্তার দিয়ে সেবার নামে রোগীদের সাথে প্রতারণা করছে, অতি শিঘ্রই তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে”।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসকল প্রতারক কিংবা পল্লি চিকিৎসকরা মূলত বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকদের সাথে যোগসাজস করে রোগীদের সাথে প্রতারনা করে যাচ্ছে। হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকরা অতিরিক্ত মুনাফার লোভেই এমনটি করছে বলে তারা মনে করেন। তাছাড়া এমন প্রতারণায় রোগীদের জীবনও বিপন্ন হতে পারে। তাই অতিশিঘ্রই এসকল প্রতারকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরী।