বাজেট মানে অনেক কিছুর প্রত্যাশা। অনেক চ্যালেঞ্জ। সব খাতের এই প্রত্যাশার মধ্যেও চলতি অর্থবছরের বাজেটে আবারও ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য। সুবিধাবঞ্চিত নারী উদ্যোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ফান্ড গঠনের প্রস্তাবনার মাধ্যমে এ বরাদ্দ রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশসহ তাদের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক শিশুর খাদ্যের ব্যবস্থা ও শিশুশ্রমিকদের শিক্ষাগ্রহণে আকৃষ্ট করার মূল লক্ষ্যে বাজেটে এ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী জানান।

এ ছাড়া জাতীয় বাজেটের পাশাপাশি অন্যান্য বছরের মতো জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। নারীর মানবিক ক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধি, দাবি আদায়ের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করা ও নারীর অবস্থা উন্নয়নে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে সংসদের বাজেট উপস্থাপনায় অর্থমন্ত্রী জানান।

বাজেট প্রস্তাবনায় আগে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, নারী উন্নয়নের জন্য বাজেটে জাতীয় জিডিপির ৪.৭৩ শতাংশ ব্যয় হবে, যা গত বছরের চেয়ে বেশি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে নারী উন্নয়ন বাজেট ছিল ২৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। নারী উন্নয়নে বরাদ্দের শতকরা হার দেশের মোট বাজেটের হিসাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭.২৫ শতাংশ। এতে সম্পৃক্ত ৪০টি মন্ত্রণালয়কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

বাজেট প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজেটে নারীদের জন্য বরাদ্দ থাকছে। কিন্তু নারীর আর্থিক নিরাপত্তা কতটা বেড়েছে, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। স্বাধীনভাবে নারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কতটা পাচ্ছে তাও ভাবার বিষয়। কর্মক্ষেত্রে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নারী কতটা দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছে, রাজনীতিতে ও প্রশাসনে ক্ষমতায়ন কতটা বেড়েছে তা হিসাব মিলিয়ে দেখার সময় এসেছে। প্রশাসনের উঁচু পদে নারীর সংখ্যা কত, আর নিচ পদে নারীর সংখ্যা কত?Ñ তাও আজ ভাবতে হবে।

ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিডব্লিউসিসিআই) সভাপতি সেলিমা আহমেদ বলেন, বাজেট তৃণমূল নারী উন্নয়ন জরুরি। অর্থমন্ত্রী নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা ঋণের ব্যবস্থা করেছেন। তাই চলতি অর্থবছরের মতো এবারও জাতীয় বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ কাজে লাগিয়ে নারীদের আরও বেশি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। তবে নারী উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধ প্রসঙ্গে সভাপতি জানান, নারীদের জন্য দেশের সব জায়গায় ব্যবসা সহজ নয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলাগুলোতে নিবন্ধন ফ্রি ও ৫ লাখ টাকার পণ্য ফি ছাড়া প্রবেশের সুযোগ দেওয়া দরকার। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানকে রেয়াদ দেওয়া, সিআইপি নির্ধারণে নারী উদ্যোক্তা কোটা রাখার মাধ্যমে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইউনিট খোলা হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাতে জামানতের অভাবে ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালুর পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। একই সঙ্গে গ্রামীণ জনপদে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নারী ও সুবিধাবঞ্চিত উদ্যোক্তারা যাতে ঋণ পেতে পারেন, সে লক্ষ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের আর্থিক সহায়তায় ‘চ্যালেঞ্জ ফান্ড’ গঠন এবং এর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ উদ্যোগের জন্য চলতি অর্থবছরের মতো ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও ১০০ কোটি টাকার প্রতীকী বরাদ্দ রাখার কথা জানান তিনি। এ ছাড়া নারীর পাশাপাশি শিশুর শারীরিক-মানসিক বিকাশকে সমভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৪ বছরের কম বয়সের প্রায় ১৫-২১ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রমিকের কাজ করে। তাই এসব শিশুকে শ্রম দানের পরিবর্তে শিক্ষাগ্রহণে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে নতুন এ বাজেট প্রস্তাবনায়।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে সাত মন্ত্রণালয়ে শিশুদের জন্য মোট বরাদ্দের পরিমাণ ৪৯ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। গত বছর যা ছিল ৩৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। এ বছর সাত মন্ত্রণালয়ের বাজেটের বরাদ্দ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চেয়ে ২২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে শুধু শিশুর জন্য বেড়েছে ২৯ শতাংশ বরাদ্দ।