ফেসবুকে নায়িকাদের নজরকারা দাপট।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে শিল্পী সংকটের কথা অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। প্রতি বছরই নতুন শিল্পীর আগমন ঘটছে। নতুনদের প্রায় সবাই নায়ক বা নায়িকা হিসেবে চলচ্চিত্রে নাম লেখান। খল অভিনেতা, কমেডিয়ান, বাবা-মা, ভাই-বোনের চরিত্রে কেউ আসতে চান না, নিজেদের কোয়ালিটি কী সেদিকে না তাকিয়ে নায়ক বা নায়িকা হতেই হবে এমন মানসিকতা পোষণ করেন তারা।

এসব কারণে চলচ্চিত্রের নায়ক বা নায়িকার সংখ্যা কম করে হলেও অর্ধশত হবে। যদিও এদের অধিকাংশই সিনেমার মহরত করেই নায়ক বা নায়িকা বনে গিয়েছেন। আবার কেউ কেউ একটি বা দুটি সিনেমায় কাজ করে বেকার বসে আছেন। আর বেকার থাকবেই না কেন! তাদের অধিকাংশই যোগ্যতার পরিচয় দিতে না পারায় দর্শক বিমুখ হচ্ছেন। গত কয়েক বছরে নতুনদের মধ্যে হাতেগোনা চার থেকে পাঁচজন নায়ক বা নায়িকা হিসেবে সফল হয়েছেন। বাকিরা নামেই নায়ক বা নায়িকা। ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা বেশ সরব। নিয়মিত ছবি পোস্ট ও বিদেশ ভ্রমণের আপডেট দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এদের মধ্যে ফেসবুকে নায়িকাদের দাপট নজরকারা।

নতুনদের মধ্যে দু-একজন খল চরিত্রে এসে সফল হয়েছেন। পেয়েছেন দর্শকের ভালোবাসা। গত কয়েক বছর এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ‘ঢাকা অ্যাটাক’ খ্যাত তাসকিন। প্রথম সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেন তিনি। চলচ্চিত্রের অনেকেই মনে করেছিলেন, ঢাকাই চলচ্চিত্রে খল অভিনেতা সংকটে ধ্রুবতারা হয়ে উঠবেন তাসকিন। কিন্তু তার মাথায় নায়ক হওয়ার ভূত চেপেছে। যে কথা, সেই কাজ। তাসকিন ঘোষণাও দিয়েছেন, খল চরিত্রে অভিনয় করবেন না বরং নিয়মিত নায়ক চরিত্রেই অভিনয় করবেন।

তাসকিন রহমান কিছুদিন আগে ‘বয়ফ্রেন্ড’ শিরোনামে একটি সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন। উত্তম আকাশ পরিচালিত এই সিনেমার শুটিং প্রায় শেষ করেছেন তিনি। গত সোমবার লাইভ টেকনোলজির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছে এই সিনেমার একটি গান। ‘মনে মনে গোপনে’ শিরোনামের ওই গানের দৃশ্যে তাসকিনের সঙ্গে দেখা যায় নবাগত লোপা নাহারকে। সুদীপ কুমার দ্বীপের লেখা গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন প্রশনজিৎ ও জেমি। সংগীতায়োজন করেছেন প্রিতম। গানের শুরুতে দেখা যায়, তাসকিন ও লোপা মোটর বাইকে আসছেন। তারপর বিএফডিসির মান্না ডিজিটাল স্টুডিওর সামনে একদল ছেলেমেয়ের সঙ্গে দুজন নাচছেন। চার মিনিট ২০ সেকেন্ডের এই গানে তাসকিনের নাচ বেশ দুর্বল মনে হয়েছে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে সিনেমাটির নির্মাতা উত্তম আকাশ বলেন, ‘গানের সঙ্গে তাসকিন খারাপ নাচ করেছেন বিষয়টি এমন নয়। আসলে কোরিওগ্রাফি অনুযায়ী নেচেছেন তিনি। কিন্তু তিনি ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। দেখে সবার ভালো লাগবে। যে কারণে আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি খলচরিত্রে যেমন ভালো করেছেন নায়ক হিসেবেও ভালো করবেন।’

তাসকিন প্রসঙ্গে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, তাসকিন খল চরিত্রে নিয়মিত হলে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থাকবেন। তাসকিন ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমায় দর্শকের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন ‘গার্লফ্রেন্ড’ সিনেমায় কতটা ভালোবাসা পাবেন সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

চলচ্চিত্রে বর্তমান সময়ে নায়ক বা নায়িকা হতে আসা প্রসঙ্গে নির্মাতা ছটকু আহমেদ বলেন, ‘নায়ক বা নায়িকা হতে হলে অবশ্যই যোগ্যতা থাকতে হবে। তা না হলে অবৈধ পথে যেতে হবে। একজন শিল্পীর প্রথমেই অভিনেতা হওয়া উচিৎ। অভিনেতা হওয়ার পর নায়ক বা নায়িকা কিংবা খল চরিত্রে কাজ করা যাবে। মিশাকে আমি প্রথমে নায়ক হিসেবেই নিয়েছিলাম। তারপর আমি ওকে বললাম তুই খল চরিত্রে যা। এরপর থেকে মিশা খল চরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছে। এখন সে দর্শকপ্রিয় হয়ে উঠেছে।’

প্রযোজক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমাদের কাছে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নায়ক বা নায়িকা হতে আসেন। এর মধ্যে অনেকেরই যোগ্যতা নেই। তারপরও তারা নায়ক বা নায়িকা হতে চান। একজন নায়ক বা নায়িকার অনেকগুলো যোগ্যতা থাকতে হয়। নতুনরা এসব বুঝতে চায় না। দেখা গেছে-তারা বোন, বান্ধবী, ভাই-বন্ধু, নেতিবাচক চরিত্র করলে ভালো করতে পারে। অনেক সময় আমরা এই পরামর্শও দিয়ে থাকি। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে যোগ্য মনে না হলে তাকে নেয়া হয় না।’

মিশা সওদাগর বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা শুধু নায়ক-নায়িক হতে আসে তা নয়। খল চরিত্রেও অনেকে এসেছে। তবে নায়কের ভাই বা বোনের চরিত্রে কেউ আসতে চাচ্ছে না। একইভাবে বলা যায়, বাবা-মায়ের চরিত্রও খুঁজে পাওয়া যায় না। কমেডিয়ান একদমই আসছে না। এটা খুবই খারাপ। নিজেদের চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলতে পারাটাই শিল্পীর পরিচয়। আর একটা বিষয় হচ্ছে এখন সিনেমার কাজ একদমই কমে গেছে। শিল্পী এসে কাজ করবেন কোথায়। সেই জায়গাটা ভালো নেই।’

ওমর সানী বলেন, ‘আমি, মান্না, সালমান শাহ প্রায় একসঙ্গে এসেছি। তখন কিন্তু বিশাল একটা যুদ্ধক্ষেত্র ছিল। এর মধ্যে থেকেই আমরা আলোচিত হয়েছি। নিজস্বতা তৈরি করতে হবে, রেমুনেশন দরকার আছে, স্টার ইমেজ দরকার আছে। এজন্য কথা বেশি না বলে কাজটা বেশি করতে হবে। এই জায়গা থেকে নিজেদের মিনিমাইজ করতে হবে। আমি নায়ক হিসেবে সফল হওয়ার পর ৫০টা সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করে সফল হয়েছি। দুই ক্ষেত্রেই সফল। আবার এখন ক্যারেক্টর শিল্পী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। চরিত্রটা ফুটিয়ে তোলাই ‍মূল কথা। নায়ক বা নায়িকা ছাড়াও সফল হওয়া যায়।’

অনেকের কথার মতো এটাও সত্য- কাক কোকিল সাজলে যেমন বেমানান তেমনি কোকিল কাক সাজলেও ভালো লাগবে না। অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ করতে পারাই প্রকৃত শিল্পীর কাজ। অভিনয়ের জন্য দর্শকের হাতে তালি পাওয়া যায়। নায়ক-নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করলেই তালি পাওয়া যায় না।