ফাইনালে বাংলাদেশ পাত্তা পায়নি পাকিস্তান।

    জয়ের নেশায় মরিয়া টাইগারদের সামনে গতকাল আবুধাবিতে পাত্তা পায়নি পাকিস্তান। ফাইনালের টিকেট নিশ্চিত করার ম্যাচে ১৯৯২ সালের বিশ^চ্যাম্পিয়নদের ৩৭ রানে হারিয়ে ১৪তম এশিয়া কাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে মাশরাফি বাহিনী। আগামীকাল ফাইনালে ভারতের মোকাবেলা করবে বাংলাদেশ। এ নিয়ে তৃতীয়বার ফাইনালে উত্তীর্ণ হলো টাইগাররা। ২০১২ সালের ফাইনালে ২ রানে পাকিস্তানের বিপক্ষে হেরেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ২০১৬ সালের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ৮ উইকেটে হারা মাশরাফি বাহিনীর সামনে সেই হারের বদলা নিয়ে শিরোপা জয়ের হাতছানি। ঘরের মাঠে যা পারেনি টাইগাররা, এবার মুরুর বুকে সেই অক্ষেপা ঘুচানোর সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ইতিহাসে ঠাঁই করে নেবে মুশফিক-মোস্তাফিজরা। পাকিস্তানকে বিদায় করার ম্যাচে মুশফিক-মোস্তাফিজ ব্যাট-বলে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। স্মরণীয় জয়ের এ ম্যাচে অন্যদের অবদানকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। দলের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল এ জয়। টাইগার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২০২ রান সংগ্রহ করে পাকিস্তান। মোস্তাফিজ ৪৩ রান দিয়ে ৪টি, মেহেদি হাসান মিরাজ ২৮ রানে ২ উইকেট লাভ করেন। রুবেল, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এবং সৌম্য সরকার একটি করে উইকেট দখল করেন। অনবদ্য ৯৯ রানের ইনিংস খেলায় ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন মুশফিকুর রহিম।
    ফিল্ডিংয়ে বরাবরই দুর্বল টাইগাররা এ অপবাদ আবুধাবিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘোচাতে সক্ষম হয়েছে। শরীরের নানা জায়গায় লুকিয়ে থাকা ইনজুরির কথা ভুলে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা শোয়েব মালিককে সাজঘরে ফেরাতে শূন্যে লাফিয়ে ওঠে টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি যে ক্যাচ লুফে নিয়েছেন তা দীর্ঘদিন সমর্থকদের চোখের সামনে ভেসে বেড়াবে।
    উইকেটের পেছনে পাকিস্তান অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদের যে ক্যাচটি মুশফিক ডানে ঝাঁপিয়ে তালুবন্দি করেছেন এক কথায় অসাধারণ ক্যাচ। মিরাজের বলে ফখর জামান মিডঅন দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলেন লাফিয়ে ওঠে দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে তাতে জল ঢেলে দেন রুবেল হোসেন। ৯৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান ব্যাকফুটে চলে গেলেও দলকে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টার করেন ইমাম উল হক। এক প্রান্ত আগলে রেখে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন ইনজামাম-উল হকের ভাতিজা। ১০৫ বলে ২ চার এবং এক ছক্কার সাহায্যে ৮৩ রান করা ইমামকে সাজঘরের পথ দেখান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এরপরই পাকিস্তানের হার সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
    এর আগে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ৩ উইকেট হারিয়েও পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৩৯ রানের লড়াকু পুঁজি সংগ্রহ করেছে টাইগাররা। গতকাল শেষের দিকের ব্যাটসম্যানরা নামের প্রতি সুবিচার করতে পারলে স্কোর লাইনটা আরো সমৃদ্ধ হতো, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাঁচা-মরার ম্যাচে সরফরাজদের বিপক্ষে টাইগারদের ব্যাটিংয়ের শুরুটা এবং শেষটা ভালো না হলেও মুশফিকুর রহিম আর মোহাম্মদ মিথুনের অসাধারণ ১৪৪ রানের জুটির সুবাদে পাকিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে তোলেন স্টিভ রোডসের শিষ্যরা। ১২ রানের মাথায় দ্বিতীয় উইকেটের পতনের পর আসেন মুশফিক। সাজঘরে ফিরেছেন প্রায় ৩৮ ওভার উইকেটে কাটিয়ে। ক্যারিয়ারের ত্রিশতম হাফ সেঞ্চুরিকে ষষ্ঠ সেঞ্চুরির পথেই এগিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি। ৪২তম ওভারের চতুর্থ বলে শাহীন শাহ আফ্রিদির বোলিংয়ে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন মুশফিক। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম হলেও, আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে এর আগে ৯৯ রানে আউট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে আরও ৩২ বার। এ ছাড়া আরো ১৪ বার ব্যাটসম্যানরা অপরাজিত থেকে গিয়েছিলেন ৯৯ রানে।
    ১৯৮০ সালে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ক্রিকেটে ৯৯ রানে আউট হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ক্রিকেটার জেওফ বয়কট। আর মুশফিকের আগে সর্বশেষ ক্রিকেটার হিসেবে গত বছর ৯৯ রানে সাজঘরে ফিরেছিলেন আইরিশ ক্রিকেটার পল স্টার্লিং। ওয়ানডেতে ৯৯ রানে সবচেয়ে বেশিবার আউট হওয়া ক্রিকেটারের নাম শচিন টেন্ডুলকার। ভারতীয় এ ক্রিকেট ঈশ^র তিনবার ফিরেছেন সেঞ্চুরি থেকে এক রান দূরে থাকতে। এ ছাড়া সনাৎ জয়াসুরিয়া ২ বার আউট হয়েছেন ৯৯ রানে।
    সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে থাকতে আউট হওয়া ব্যাটসম্যানের তালিকায় রয়েছেন ম্যাথু হেইডেন, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ক্রিস গেইল, রাহুল দ্রাবিড়, বিরাট কোহলি, এবি ডি ভিলিয়ার্স, গ্রায়েম স্মিথের মতো ক্রিকেটারদের নাম। এ তালিকার সবশেষ সংযোজন বাংলাদেশ দলের মুশফিকুর রহিম। মোহাম্মদ মিথুন ৬০ রান করে আউট হয়ে গেলেও সেঞ্চুরির পথেই ছিলেন মুশফিকুর রহিম। কিন্তু দুর্ভাগ্য মাত্র ১ রানের জন্য ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরিটা হাতছাড়া হয়ে গেল বাংলাদেশের লিটল মাস্টার মুশফিকের। এর আগে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই উইকেট দিয়ে ফেরেন নাজমুল হোসেন শান্তর পরিবর্তে মাঠে নামা সৌম্য সরকার। ৬ রান করে জুনায়েদ খানের বলে বোল্ড হয়ে যান লিটন দাস। সাকিবের পরিবর্তে ব্যাট করতে নামা মুমিনুল হক মাত্র ৫ রান করে আউট হয়ে যান। তিনি বোল্ড হন শাহিন আফ্রিদির বলে। এরপরই জুটি বাঁধেন মুশফিক আর মিথুন। আগের ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংস খেলা ইমরুল কায়েস গতকাল ১২ রানে সাজঘরে ফিরে যান। মাহমুদউল্লাহ সম্ভাবনা জাগিয়েও বেশি দূর যেতে পারেননি ব্যক্তিগত ২৫ রানে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি। পাকিস্তান বোলারদের মধ্যে জুনায়েদ খান মাত্র ১৯ রানে ৪ উইকেট দখল করেন। অপর বোলারদের মধ্যে শাহীন শাহ আফ্রিদি এবং হাসান আলী ২টি করে উইকেট লাভ করেন।