প্রাইভেট ক্লিনিক বনাম সাধারন রোগী

Smiley face

0
5745
Smiley face

নোমান মাহমুদঃ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে যে কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভূক্ত, চিকিৎসা প্রাপ্তির অধিকার তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমান সরকার ও দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মানুষের মৌলিক এই অধিকার বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। বিভিন্ন সময় দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বেশ কিছু  মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ঘরে ঘরে চিকিৎসা সেবা পৌছে দিতে সারা দেশে স্থাপন করা হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। এছাড়াও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সতো আছেই।

কিন্তু দেশের জনগনকে সেবা দিতে সরকারী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। আবার উপজেলা পর্যায়ের সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল না থাকায় জরূরী মুহূর্তে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাধারন রোগীদের শরণাপন্য হতে হয় কাছাকাছি অবস্থিত বেসরকারী হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকগুলোর। বিনিময়ে

বেসরকারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হয় উচ্চ মানের সেবামূল্য। কিন্তু উচ্চ মানের এই সেবা মূল্য পরিশোধ করার পরেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখা যায় বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুব্ধে অবহেলা ও ভূল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর মত স্পর্শকাতর অভিযোগ। আবার সেসকল অভিযোগের বিষয়ে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অজ্ঞাত কারনে তা কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে যা কোনভাবেই কাম্য নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়া যায় কিছু কিছু বেসরকারী চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান খোদ দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই  নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। যার কারনে প্রতিনিয়তই সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতারিত হচ্ছে সেবা গ্রহিতারা।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী একটি উপজেলা সাভার। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এই উপজেলায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা অন্যান্য উপজেলার তুলনায় খানিকটা বেশি। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বিপরিতে উপজেলায় সরকারী চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসাবে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক। তবে সরকারী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও, নিতান্তই কম নয় বেসরকারী চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। অসংখ্য প্রাইভেট ক্নিনিক-হাসপাতাল, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সাভারের আনাচে-কানাচে। এমনই একটি বেসরকারী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ”নিউ আল মদিনা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার প্রাইভেট লিঃ”।

বিগত দিনে সাভারের রেডিও কলোনী এলাকার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই বেসরকারী ক্লিনিকের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অবহেলা জনিত ও ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সর্বশেষ বিগত ২০১৭ সালের  পহেলা এপ্রিলে ভূল চিকিৎসায় শাহানাজ বেগম (৩০) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এঘটনার পরপর ঐ ক্লিনিক ছেড়ে তাৎক্ষনিক পালিয়ে যায় তৎকালীন হাসপাতালের মালিক দীপকসহ অভিযুক্ত চিকিৎসক ও অন্যন্য নার্স-ষ্টাফরা। তোপের মুখে ক্লিনিকটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া সহ  শাহনাজ বেগমের মৃত্যুর বিষয়ে নিউ আল মদিনা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে। সেসময় তদন্ত কমিটি তদন্তে কি পেয়েছিলো তা জানা না গেলেও সরেজমিনে গতকাল নিউ আল-মদিনা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় এখনো সেই আগের দশাতেই পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

পরিদর্শনকালে দেখা যায়, একটি বিল্ডিংয়ের দোতলায় অবস্থিত ক্লিনিকটির ভিতরে  ফার্মেসীর পাশেই একটি বোর্ডে সাটিয়ে রাখা হয়েছে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আবশ্যক যাবতীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন। যার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত ক্নিনিক ও প্যথলজি পরিচালনার লাইসেন্স, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সনদ, পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট রেজিঃ, ফায়ার সার্ভিসের সনদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। কিন্তু এর কোনটিরই মেয়াদ নেই। সেবাগ্রহিতাদের নিকট থেকে সেবা মূল্যের সাথে মূসক সংযোজন করে তা আদায় করা হলেও তা জমা হচ্ছে না সরকারী কোষাগারে।

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লিনিকটির কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ ডিজি লাইসেন্স নবায়ন করেছে ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে। বর্তমান সময়ের সাথে যার ব্যবধান প্রায় ১০ বছর। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ও কাঠামোগত ত্রুটির জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে পৌরসভা ২০১৩ সালের পরে আর ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করেনি। তাছাড়া ১০ শয্যা বিশিষ্টি এই প্রতিষ্ঠানটির রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ডিপ্লোমাধারী নার্স, এমনকি প্যথলজি পরিচালনায়ও মানা হচ্ছে না নীতিমালা।

এবিষয়ে সাভার পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মোঃ আমজাদ জানান, ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্সের শর্তসমুহ পূরন না করায় আবেদন করার পরেও তাদের লাইসেন্স প্রদান করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে দেখা যায়, সর্বশেষ ভূল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পর ক্লিনিকটি সাময়িকভাবে বন্ধ করার  অনেক আগেই ক্লিনিকটির স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিলো। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স নবায়ন না করেই কি করে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় পরিচালিত হচ্ছে সে প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছেই।

ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাও পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে এর মালিকানায় রয়েছে ডাঃ বি.কে বিশ্বাস নামে একজন চিকিৎসক। কিন্তু মালিকানা পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়নি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির। যেখানে পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স নেই, সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্সের নবায়ন কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য বিভাগের অনুমোদন পাওয়ার প্রশ্ন অনেকটাই হাস্যকর বটে।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে কোন কিছু না থাকা সত্ত্বেও থেমে নেই রোগীদের সেবা প্রদান। আর সাধারন রোগীরাও  অজ্ঞতাবশত তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কতটা মানসম্মত সেবা পাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

এবিষয়ে কথা বললে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোঃ আমজাদুল হক বলেন, ”শিল্পাঞ্চল হওয়ায় সাভার উপজেলাটি অত্যন্ত জনবহুল। এই বিপুল সংখ্যক জনগনকে সেবা দিতে সাভারে  মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য প্রাইভেট ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। তারা রোগীদের ভালো সেবাও দিচ্ছে। আবার রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান অনিয়মও করছে। তাদের অনিয়ম নিয়ে আমাদের কাছে যখন কোন অভিযোগ আসে, তখন আমরা অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে বিধি মোতাবেক তদন্ত কমিটি গঠন করি এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমানিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সুপারিশসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রতিবেদন প্রেরন করি। এর পর ব্যবস্থা গ্রহনের বিষয়টি সম্পূর্ন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভর করে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে স্বাস্থ্য সেবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেকোন প্রকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার।”

স্বাস্থ্য সেবার মত স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে বিভিন্ন বেসরকারী ক্লিনিক, হাসপাতালগুলোর এমন অনিয়ম দ্বারা প্রতিনিয়তই প্রতারিত হচ্ছেন সাধারন রোগীরা। কখনোবা ঘটছে অপ্রিতিকর ঘটনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসকল প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন না করলে অসাধু হাসপাতাল ব্যবসায়ীদের অনিয়মের এই চর্চা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। যার দরুন সাধারন রোগীদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ্য হবে সরকার। অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে দেশের স্বাস্থ্য খাত।

LEAVE A REPLY