প্রাইভেট ক্লিনিক বনাম সাধারন রোগী

অধিকাংশ রিপোর্ট ভুল হওয়ার আশংকা

Smiley face

নোমান মাহমুদঃ চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোন ব্যক্তির শারীরিক সমস্যা ও রোগ নির্ণয়ে রোগীদের স্বাস্থ্য পরিক্ষার কোন বিকল্প নেই। কোন ব্যক্তির শারীরিক সমস্যা কিংবা কোন রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকারের পরিক্ষা আবিষ্কার করেছেন। যার মূল লক্ষ্য সঠিক সময়ে সঠিকভাবে রোগীদের রোগ নির্ণয় করে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা। কেননা সঠিকভাবে কোন রোগীর রোগ নির্ণয় না করা গেলে তাকে কখনোই সঠিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা সম্ভব নয়। আর এর জন্য চিকিৎসককে সেবা প্রদানে নির্ভর করতে হয় রোগের উপসর্গ সহ রোগীর রক্ত, মল-মুত্র, এক্স-রে, মাইক্রোবায়োলজী, বায়োকেমিষ্ট্রিসহ বিভিন্ন প্রকার পরিক্ষার ফলাফলের উপর।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যেই রিপোর্ট কিংবা পরিক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে কোন চিকিৎসক তার রোগীকে ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন, সেই রিপোর্টই যদি ভুল হয় বা ভুল হওয়ার আশংকা থাকে তবে একজন সেবাপ্রার্থী রোগীর অবস্থাটা কেমন হয় ! বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, একটি ভুল রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে কোন রোগীর দেহে ভুল মেডিসিন প্রয়োগের কারনে রোগী আরোগ্য লাভের বিপরীতে কোন রোগীর দেহে আরও নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। ভুল মেডিসিন ব্যবহারে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় একজন মানুষের শরীরে মারাতœক ক্ষতিসাধন হওয়াসহ ঘটতে পারে প্রানঘাতী দূর্ঘটনা। আবার সব মেডিসিনে তাৎক্ষনিক কোন সমস্যা দেখা না দিলেও এর কিছু না কিছু প্রভাব শরীরের অভ্যন্তরে রয়েই যায়। মেডিসিন ভেদে তা ধীরে ধীরে শরীরের অভ্যন্তরে কোন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে বিকল করে তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। আর একজন সাধারন মানুষ কখনো জানতেও পারবে না কি কারনে তার দেহে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে কিংবা কিসের প্রভাবে একজন মানুষের জীবন প্রদিপ পর্যন্ত নিভে গেল।

সাভারের তালবাগে অবস্থিত অন্যতম একটি বেসরকারী চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্রিন্স হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। হাসপাতাল সেবার পাশাপাশি দীর্ঘদিন যাবত প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্যাথলজি পরিচালনার মাধ্যমে রোগীদের বিভিন্ন প্রকার পরিক্ষা-নিরীক্ষাও করে আসছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে লাইসেন্সধারী এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতিষ্ঠানে আগত রোগীদের কেমন সেবা দিচ্ছে তা যাচাইয়ে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক মনোনীত একটি বিশেষজ্ঞ পরিদর্শন টিম। তাদের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির গুরুতর কিছু অনিয়ম ধরা পড়ে।
পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ টিম প্রতিষ্ঠানটির প্যাথলজিতে প্রচুর পরিমানে মেয়াদোর্ত্তীর্ণ রি-এজেন্ট পান। তাছাড়া অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির এক্স-রে কক্ষে প্রতিরক্ষামূলক লেড শিট নেই, টেকনোলজিষ্টের সাক্ষরেই করা হচ্ছে রিপোর্ট প্রদান, ত্রুটিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। যার ফলশ্রুতিতে প্রিন্স হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার নামক এই চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের প্যাথলজি শাখার যাবতীয় কার্যক্রম সাময়িক বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ২২শে জানুয়ারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডাঃ কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনের সাক্ষরীত এক চিঠিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেইসাথে কেন প্রতিষ্ঠানটির প্যাথলজি লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না তা পরবর্তী ১৪ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ভাবে জানাতে বলা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, প্যাথলজিতে মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট ব্যবহার করা হলে অধিকাংশ পরিক্ষার ফলাফলই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর কোন ভুল রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে রোগীকে চিকিৎসা প্রদান করা হলে সেই চিকিৎসাও হবে ভুল। আর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে শুধু রোগীদের সাথে প্রতারনাই করছে না বরং এর দ্বারা রোগীদের স্বাস্থ্য ঝুকিও তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া প্রিন্স হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের এক্স-রে কক্ষে প্রতিরক্ষামূলক লেড শিট নেই যা থাকা বাধ্যতামূলক। এক্স-রে কক্ষে লেড শিট না থাকা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরুপ বলে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রিন্স হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের চেয়ারম্যান শাহ মোঃ রাসেল উদ্দিন প্রিন্স বলেন, ”আমাদের যেসকল ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিলো, তা আমরা সংশোধন করেছি। তাছাড়া লিখিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠির জবাবও আমরা দিয়েছি। এখন বাকিটা তাদের উপর। আমাদের যা করনীয় ছিলো, তা আমরা করেছি।”
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠির জবাব দেওয়ার পর বিধি মোতাবেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রিন্স হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের প্যাথলজি শাখার কার্যক্রম সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ”না আর কোন লিখিত অনুমোদন দেওয়া হয়নি”।

এবিষয়ে কথা বললে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহঃ পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডাঃ মোঃ আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “যেহেতু সরকারী বিধি মোতাবেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চিঠির মাধ্যমে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে তাদের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেহেতু বিধি মোতাবেক পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে তা অবৈধ হবে।”

পর্ব-2 পড়ুন

পর্ব-1 পড়ুন