প্রাইভেট ক্লিনিক বনাম সাধারন রোগী

চিকিৎসা নাকি অপচিকিৎসা

Smiley face

নোমান মাহমুদঃ মানবদেহের গঠন অত্যন্ত বৈচিত্রময়। এর প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গ একটি নির্দিষ্ট নিয়মতান্ত্রিক প্রাকৃতিক  পদ্ধতি মেনে পরিচালিত হয়ে থাকে। মানব শরীরে যখন কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়, তখন সেই সমস্যা দ্বারা একজন সাধারন রোগীর কাছে কিছু উপসর্গ ব্যাতিত আর কিছুই ধরা পড়েনা। তাই দেহে কোন প্রকার সমস্যা বা রোগের উপস্থিতি অনুভব করা মাত্রই সাধারন মানুষ অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরনাপন্য হন। আর একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকই পারেন পরিক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে দেহের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সঠিক চিকিৎসা প্রদান করতে। আর তাই কোন চিকিৎসক কিংবা চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারন মানুষের থাকে অগাধ আস্থা। কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠান যদি সাধারন মানুষের আস্থাকে কাজে লাগিয়ে রোগীদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে অনিয়মের দ্বারা রোগীদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়, তবে সাধারন মানুষের দূর্ভোগের অন্ত থাকেনা।

সম্প্রতি সাভারের কয়েকটি বেসরকারী ক্লিনিক ও হাসপাতাল পরিদর্শন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগন। এর মধ্যে অন্যতম একটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ’সাভার প্রাইম হাসপাতাল’। সাভারের তালবাগস্থ্য থানা রোডে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিকট প্রতিষ্ঠানটির গুরুতর কিছু অনিয়ম ধরা পড়ে। যার মধ্যে রয়েছে অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও প্যাথলজি কক্ষে ব্লাড ব্যংকের সকল কার্যক্রম পরিচালনা, রি-এজেন্ট ফ্রিজে রি-এজেন্টের সাথে ব্লাড ব্যাংক সংরক্ষন, শয্যা সংখ্যার বিপরিতে যেখানে ৫ জন চিকিৎসক থাকা অবশ্যক সেখানে মাত্র ২ জন চিকিৎসক দিয়েই চলছে আগত রোগীদের সেবা প্রদান, অপর্যাপ্ত নার্স।

তাছাড়া হাসপাতালটি পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা অপারেশন থিয়েটারের আলমারিতে প্রচুর পরিমান ঔষধের সন্ধান  পান, যা নিয়মবহির্ভূত, এমনকি অপারেশন নোটে কোন সার্জনের সাক্ষর পাওয়া যায়নি যা বাধ্যতামূলক। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির এমন গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ার পর চলতি বছরের ২২শে জানুয়ারী এক চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডাঃ জাহাঙ্গীর হোসেন প্রতিষ্ঠানটি সাময়িক বন্ধের নির্দেশ দেন, সেইসাথে কেন সাভার প্রাইম হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবেনা জানতে চেয়ে কৈফিয়ত তলব করেন।

এর আগে ২০১৫ সালের ১৫ই অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভূল ও অপচিকিৎসায় আরিফা আক্তার (২৮) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। সেসময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গনমাধ্যমকে বিষয়টি একটি দূর্ঘটনা বলে অভিহিত করেন এবং রোগীর শরীরের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরনের জন্য রোগীর মৃত্যু হয় বলে জানানো হয়। এঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিলো।

“নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন-২০০২”  অনুসারে কোন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন বিহীনভাবে রক্ত সংরক্ষন করতে পারবে না, যা মানছে না সাভার প্রাইম হাসপাতাল নামক চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বিভিন্ন চিকিৎসায় যে পরিমাণ রক্ত ব্যবহৃত হয়, এর মধ্যে জেনারেল সার্জারিতে ২৩ শতাংশ, জেনারেল মেডিকেল ১৫ শতাংশ, কার্ডিওথোরাসিক ১৩ শতাংশ, অর্থোপেডিকস ১১ শতাংশ, হেমাটোলজি ৯ শতাংশ, দুর্ঘটনা ও জরুরি প্রয়োজনে আট শতাংশ, কিডনি, নবজাতক ও শিশু সার্জারিতে ছয় শতাংশ, ইনটেনসিফ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চার শতাংশ, অবসট্রেটিক ও গাইনোকোলজি তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ রক্ত প্রয়োগ করা হয়। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, যে রোগীর যে উপাদান যতটুক লাগবে, সেটি সঠিকভাবে দেয়াই নিরাপদ পরিসঞ্চালন। এ ক্ষেত্রে ভুল বা অপরিশোধিত রক্ত দেয়া যাবে না। স্বেচ্ছায় নিরাপদ রক্তদাতার শরীর থেকে রক্ত নেয়ার পর অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দিয়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে স্ক্রিনিং করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য  সংস্থার আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত পাঁচটি ঘাতক ব্যাধি হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইচআইভি এইডস, ম্যালেরিয়া এবং সিফিলিস রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে হবে। আর সংগ্রহকৃত রক্তের ক্ষেত্রে কোল্ড চেইন ম্যানেজমেন্ট ফলো করতে হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় ভাগে বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার ধারা-২-এ বলা আছে, ‘প্রত্যেক রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের ল্যাবরেটরিতে একটি কিংবা দুটি ফার্মাসিউটিক্যাল রেফ্রিজারেটর, ব্লাড ব্যাংক ফ্রিজ, ডিপফ্রিজ, রক্তের স্যাম্পল সংগ্রহের জন্য ডমেস্টিক ফ্রিজ, কম্পাউন্ট মাইক্রোসকোপ, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, ওয়াটার বাথ, ইনকিউবেটর, ভিউবক্স, ডিস্টিল ওয়াটার প্লান্ট, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল কিটস ও রি-এজেন্ট থাকতে হবে। এ ছাড়া বিধিমালা ৯ (২) (ঘ) তে বলা আছে, রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রে রক্ত পরিসঞ্চালন কাজে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার, দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, টেকনিক্যাল সুপারভাইজর, রেজিস্টার্ড নার্স এবং ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট থাকতে হবে। অথচ সাভার প্রাইম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই সবকিছুই করছে তাদের প্যাথলজি ল্যবরেটরি কক্ষে।

অন্যদিকে দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক চিঠির মাধ্যমে গত ২২শে জানুয়ারি সাভার প্রাইম হাসপাতাল নামক এই প্রতিষ্ঠানটিকে সাময়িক বন্ধের নির্দেশ প্রদান করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির সকল কার্যক্রম এখন পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে কোন বেসরকারী চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের সুযোগ পায়, সেখানে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক বন্ধ ঘোষনার পরেও কি করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

আর একটি বন্ধ ঘোষিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারন রোগীরা সেবামূল্যের বিনিময়ে চিকিৎসা ক্রয় করছেন নাকি অপচিকিৎসা, সে প্রশ্নের উত্তর নেই কারোও কাছেই। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রতিষ্ঠানটি সাময়িক বন্ধের ঐ  চিঠির অনুলিপি ঢাকা জেলা প্রসাশক সহ র‌্যব-৪ এর পরিচালক বরাবর প্রেরন করা হলেও এবিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোন দপ্তর থেকেই এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি সাময়িক বন্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। ব্যবস্থা নেয়নি স্থানীয় প্রসাশন।

এবিষয়ে জানতে চাইলে, সাভার প্রাইম হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ খালেদা খাতুন এ্যানী  বলেন, ”না হাসপাতালের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ করিনি কারন, কারন তারা (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগন) যে বিষয়গুলো সমস্যা বলা হয়েছিলো তা সংশোধন করা হয়েছে। তাছাড়া ব্লাড ব্যাংকের যে বিষয়টা সেটি পরিদর্শন টিম আশার আগেই আমাদের আবেদন করা ছিলো। এছাড়াও অন্যান্য কিছু সমস্যা ছিলো, কিন্তু কোনটাই গুরুতর না, তবুও তারা আমাদের ডেকেছিলো এবং আমার স্বামী (হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক) গিয়ে তাদের সাথে বিষয়টি কথা বলে এসেছে।

অন্যদিকে সাভার প্রাইম হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠির জবাব আমি দিয়ে এসেছি”|

চিঠির জবাব দেওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্বের নির্দেশনা বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করার অনুমোদন দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না আর কোন চিঠি দেয়নি তবে আমার সাথে কথা হয়েছে, তারা বলেছে কোন অসুবিধা নাই, আমরা পরবর্তিতে গেলে জানাবো।”

এবিষয়ে কথা বললে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহঃ পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডাঃ মোঃ আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “যেহেতু সরকারী বিধি মোতাবেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চিঠির মাধ্যমে অভিযুক্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কার্যক্রম সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেহেতু বিধি মোতাবেক পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে তা অবৈধ হবে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন কোন চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গুরুতর অনিয়মের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়, তখন সেখানে সাধারন রোগীদের ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুকির সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর যদি রক্ত পরিসঞ্চালন জনিত ত্রুটি থাকে তাবে এর দ্বারা কোন রোগী রক্তবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও তার জীবন ঝুকির মধ্যে পড়তে পারে। সুতরাং চিকিৎসা সেবার মত স্পর্শকাতর বিষয়ে কোন প্রকার অবহেলা না করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা ব্যাতিত কোন বিকল্প হতে পারে না।