নির্বাচনের জন্য নওয়াজ শরীফ আজীবন নিষিদ্ধ: পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট

পাকিস্তানে দুর্নীতির দায়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়া পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে রাষ্ট্রীয় পদে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এ রায় দিয়েছেন দেশটির উচ্চ আদালত।
পাকিস্তানের ডন নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার (১৩এপ্রিল) প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে এই রায় দিয়ে নওয়াজের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ নিয়ে সৃষ্ট অস্পষ্টতা দূর করেন। বিচারপতি ওমর আতা বান্ডিয়াল রায় পড়ে শোনান।

পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালতের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে জারি করা এক রুলে জানায়, পাকিস্তানে সংবিধানের ৬২ (১) (এফ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেউ অযোগ্য ঘোষিত হলে তাকে আজীবনের জন্য অযোগ্য বিবেচনা করতে হবে। এই রুলের কারণে নওয়াজের পাশাপাশি তেহরিক ই ইনসাফ নেতা জাহাঙ্গীর তারিনও আজীবনের জন্য অযোগ্য হলেন।

পনামা পেপারস-এর মামলায় ২০১৭ সালে ওই ৬২ ধারাতেই নওয়াজকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তবে ওই ধারায় অযোগ্যতার মেয়াদ নিয়ে অস্পষ্টতা থাকায় নওয়াজ আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছেন কিনা, তা নিয়ে বিভক্ত মতামত দিয়েছিলেন আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের জারিকৃত রুলের কারণে সেই বিভক্তি দূর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো। রায়কে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে প্রভাবশালী পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন আশঙ্কা জানিয়েছে, এই রুলের কারণে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের পট পরিবর্তন হতে পারে।

সংবিধানের ৬২ (১) (এফ) অনুচ্ছেদ অনুসারে পাকিস্তান পার্লামেন্টের সদস্য হতে গেলে কোনও ব্যক্তিকে ‘সাদিক এবং আমিন’ (সৎ এবং ন্যায়নিষ্ঠ) হতে হবে। ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই এই অনুচ্ছেদের আওতায় বিচারপতি আসিফ সাইদ খোসার নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ পানামা পেপারস মামলায় নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।

তবে এই অযোগ্যতার মেয়াদ নিয়ে বিভক্ত মতামত দিয়েছিলেন আইন বিশ্লেষকরা। শুক্রবার (১৩ এপ্রিল)পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রুলে বলা হয়, ৬২(১)(এফ) অনুচ্ছেদের আওতায় যারাই অযোগ্য ঘোষিত হবে তারা আজীবনের জন্য সরকারি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনে নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হবেন। প্রধান বিচারপতি মিঞা সাকিব নিসারের নেতৃত্বে বিচারপতি শেখ আজমত সাইদ, বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়াল, বিচারপতি ইজাজুল আহসান এবং বিচারপতি সাজ্জাদ আলি শাহকে নিয়ে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এই আদেশ জারি করেন।।

৬২(১)(এফ) অনুযায়ী, অযোগ্য ঘোষিতরা কতদিন পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না তা নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা ছিল না। তবে ৬৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে একটি সময়সীমা পার হওয়ার পর তিনি আবার যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। সে কারণেই ২০১২ সালের ১৯ জুন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে ৬৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই অনুচ্ছেদের আওতায় তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল।

৬২(১)(এফ) অনুচ্ছেদের আওতায় অযোগ্য ঘোষণার মেয়াদকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা ১৭টি আপিল ও পিটিশনের শুনানি শেষে ১৪ ফেব্রুয়ারি রায় অপেক্ষমান রাখে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ। সর্বশেষ শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল আশতার বেঞ্চকে বলেন, ৬২(১)(এফ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযোগ্য ঘোষিতরা আজীবনের জন্য অযোগ্য হবেন কিনা তা বলা কিংবা সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আদালতের কাজ নয়। তিনি যুক্তি দেন, এ সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টে নেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেছিলেন, ওই অনুচ্ছেদে অযোগ্য ঘোষণার মেয়াদ নেই। ভিন্ন ভিন্ন মামলা অনুযায়ী আদালত আলাদা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

শুক্রবার (১৩ এপ্রিল) সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ পড়ে শোনাতে গিয়ে বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়াল বলেন, ভবিষ্যতে ৬২(১)(এফ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনও পার্লামেন্ট সদস্য কিংবা সরকারি চাকরিজীবীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তা স্থায়ী বলে বিবেচনা করা হবে। এসব ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না কিংবা পার্লামেন্ট সদস্য হতে পারবেন না। ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই) নেতা জাহাঙ্গীর তারিনকে অযোগ্য ঘোষণা করে শীর্ষ আদালতের আলাদা আরেকটি বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টের নতুন এই আদেশে নওয়াজের মতো তিনিও আজীবনের জন্য অযোগ্য হলেন। রায় ঘোষণার আগে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মিঞা সাকিব নিসার বলেন, জনগণের জন্য ‘ভালো বৈশিষ্ট্যের নেতা’ প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল দুনিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং রাঘববোয়ালদের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস করে সাড়া ফেলে দেয় আলোচিত ‘পানামা পেপারস’। ফাঁস হওয়া ওই গোপন নথিতে অর্থ পাচারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছেলের নাম উঠে আসায় নিজ দেশে চাপের মুখে পড়েন তিনি। বিরোধী দলগুলো থেকে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়।

২০১৬ সালের ১ নভেম্বর নওয়াজ শরিফ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশে অবৈধ বিনিয়োগের অভিযোগ তদ