”নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার”

নোমান মাহমুদঃ দেশের জনজীবনের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সেবার মত একটি স্পর্শকাতর খাতও অনিয়মের ছোবলে দিনের পর দিন অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। মানব সেবার ব্রত নিয়ে পথচলা চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা যেন ভুলতে বসেছে তাদের পেশাগত উদ্দেশ্য। আর তাই মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রোগীদের নিকট থেকে উচ্চমানের সেবামূল গ্রহন করেও সেবা প্রদানে ব্যবহার করছে নিম্নমানের চিকিৎসা উপকরন, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ। শুধু তাই নয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বিভিন্ন ব্যাক্তি মালিকানাধীন চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পল্লি চিকিৎসকদের গলায় ভুয়া ডিগ্রির সাটিফিকেট ঝুলিয়ে দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানে আগত রোগীদের সেবা প্রদান করছে। শুধু রাজধানী ঢাকা বা তার আশেপাশের এলাকায় নয়, এমন চিত্র বর্তমানে গোটা দেশে। প্রতিনিয়তই দেশের পত্র-পত্রিকায় ফুটে উঠছে ব্যাক্তি মালিকানাধীন চিকিৎসা খাতের লাগামহীন চিকিৎসা বানিজ্যের অস্থিতিশীল এই চিত্র। আর সেই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি রাজধানীর স্বনামধন্য কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে র্যা বের ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানের ফলাফলের মধ্য দিয়ে। সর্বশেষ গত ২১শে মার্চ রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধের সন্ধান পান র্যা বের ভ্রাম্যমান আদালত, পাওয়া যায় মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট। এছাড়াও র্যা বের ভ্রাম্যমান আদালত গত বুধবার গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে রাজধানীর শ্যমলীতে অবস্থিত ২টি প্রাইভেট ক্লিনিক বন্ধ করে সিলগালা করে দেয়।
অপরদিকে দিনের পর দিন দেশের প্রাইভেট চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অনিয়মের দ্বারা স্বাস্থ্য খাতকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করলেও বিপরিতে দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের স্বল্প সংখ্যক জনবল নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জনগুরুত্বপূর্ণ এই খাতটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিদর্শন করছেন। পরিদর্শনকালে কোন প্রতিষ্ঠানের গুরুতর কোন অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে বিধি মোতাবেক সেগুলোকে সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা জারি করা সহ কেন অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে কৈফিয়ত তলব করছেন। সাময়িক বন্ধের নির্দেশনার চিঠি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ছাড়াও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের লক্ষে অনুলিপি প্রেরন করা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বরাবর। কিন্তু জেলা প্রশাসন বরাবর চিঠি পাঠানো হলেও এবিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করতে দেখা যায়না প্রশাসনের কর্মকতাদের। এদিকে প্রশাসনের এই উদাসীন ভুমিকার সুযোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক বন্ধ ঘোষিত হাসপাতাল-ক্লিনিকও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর স্বদর্পে পরিচালিত হতে থাকে। মাঝ থেকে কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে সেবার বদলে প্রতারনা ক্রয় করে সাধারন রোগীরা।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত আলোক হাসপাতাল, সাভারের প্রিন্স হাসপাতাল, পুরান ঢাকায় অবস্থিত ডিজি সাউন্ড হেয়ারিং কেয়ার এন্ড এইড সেন্টার সহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল পরিদর্শন করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে মিরপুরের আলোক হাসপাতাল ও পুরান ঢাকার ডিজি সাউন্ড হেয়ারিং কেয়ার এন্ড এইড সেন্টারকে অবিলম্বে তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। বন্ধের নির্দেশনার সেই চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয় ঢাকা জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, পরিচালক র্যা বের-৪ সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কিন্তু নির্দেশনার অনুলিপি প্রেরন করা হলেও এসকল ব্যাক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বিরুদ্ধে এখন অবধী কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। আর কেনইবা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে না সে বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ বলছেন, হতে পারে ’ম্যনেজ সাংস্কৃতি’র প্রভাব স্থানীয় প্রশাসনের উপরেও বিরাজ করছে। যদিও বিষয়টি মানতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা, তবে ’ম্যানেজ সাংস্কৃতি’ বিষয়টি অস্বীকার করলেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নে আশার বানী আর অন্যের উপর দায় চাপানো ছাড়া এই প্রশ্নের কোন সদুত্তর কেউ দিতে পারেননি।

ঢাকার সাভার উপজেলায় সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা জারি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কথা হয় সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মো আমজাদুল হকের সাথে। প্রাইভেট ক্লিনিক বন্ধের এই বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ”আমি এবিষয়ে কোন চিঠি পাইনি”। পরে প্রতিবেদক সেসকল চিঠির কপি তাকে দেখালে তিনি বলেন, ”চিঠির অনুলিপি জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে, এবিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করলে ইউ.এন.ও স্যার (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) করবেন। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার ক্ষমতা তার আছে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য তিনি যদি আমাকে ডাকেন, আমি যেকোন মুহুর্তে প্রস্তত আছি, আমার কোন অসুবিধা নেই”।
এবিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ রাসেল হাসানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথমে প্রতিবেদককে বলেন, ”এটাতো আমার দেখার বিষয় না, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আছে তারা দেখবেন, তারা বন্ধ করবেন”।
কিন্তু খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িক বন্ধের ঘোষনা দিয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সাময়িক বন্ধের এই ঘোষনার পর যেহেতু বিধি মোতাবেক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হলে তা অবৈধ হবে সেহেতু কোন প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনের বাধা কোথায় তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ”আমি চিঠি এখনো পাইনি, চিঠি পেলে বিষয়টি দেখবো”। এর পরদিন প্রতিবেদকের পক্ষ্য থেকে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনার চিঠির কপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রাসেল হাসানকে সরবরাহ করা হয়। চিঠি সরবরাহের পর তিনি (ইউএনও) বিভিন্ন ব্যস্ততা দেখিয়ে পরবর্তী ২/১ দিনের মধ্যে বিষয় দেখবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন। এরপর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হলেও এখন অবধি সেসকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক সাভারের প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোকে সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা জারি করা হয় চলতি বছরের ২২ শে জানুয়ারি। সেই হিসাবে নির্দেশনা জারির পর ইতিমধ্যে ২ মাসেরও অধিক সময় অতবাহিত হয়ে গেছে।

অন্যদিকে দেখা যায়, প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের প্রশ্নে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ হাসান রাসেল হাসান প্রাইভেট ক্লিনিক বন্ধের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বলে জানায়। কিন্তু বিভিন্ন সময় দেখা যায় কোন প্রাইভেট ক্লিনিকে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ছাড়াই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, র্যা বের ভ্রাম্যমান আদালত আইনগত ব্যবস্থা করে থাকেন। ইতিপুর্বে এমন অনেক ক্ষেত্রে বহু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করাসহ বিভিন্ন প্রকার শাস্তি প্রদানের নজির আমাদের দেশে আছে। কোন এলাকায় কোন অবৈধ প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে আইনগতভাবেই স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেন। আর যেখানে কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অনিয়মের দ্বারা জনগনের স্বাস্থ্য ঝুকি তৈরীর সম্ভাবনা তৈরী হয় তখন সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনে বাধা কোথায় তা কোনভাবেই স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশে প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার পরিচালিত হয় ”দ্যা মেডিকেল প্র্যাকটিস এন্ড প্রাইভেট ক্লিনিক এন্ড ল্যাবরেটরীস অর্ডিন্যান্স” দ্বারা। যা প্রনিত হয় স্বাধীনতার পর ১৯৮২ সালে। বিদ্যমান এই আইনটি তৎকালীন সময়ের জন্য যুগপযোগী হলেও বর্তমান সময়ের জন্য প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আইনটি যুগপযোগী নয় বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা। আইনটির কিছু দুর্বলতার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তেমন কোন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারেনা। আর যতটুকুওবা পারছেন, সেটুকু বাস্তবায়নেও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা না থাকায় দেশের চিকিৎসা খাতের প্রাইভেট সেক্টরটি লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার মত অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতি কোন নির্দেশনা জারি করলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের মনে হয়তো এটা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে সরকারের অধিদপ্তর নির্দেশনা জারি করলেও তা বাস্তবায়নে কখনোই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করা বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবেন না। আর তাই অধিদপ্তরের নির্দেশনা থাকলেও তা তোয়াক্কা করছে না প্রাইভেট ক্লিনিক-হাসপাতাল-ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিকরা।
আর এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে সরকারের বা সরকারের কোন দপ্তরের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার ! সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নাকি স্থানীয় প্রশাসনের ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই এমনটি হচ্ছে। আমাদের দেশে এমনিতেই সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে জনবল সংকট রয়েছে, এর পরে যদি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকে তবে যথাযথ আইনের প্রয়োগ সম্ভব না। সরকারের বিভিন্ন বডি যদি তাদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করে তবে আইনের বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে, উপকৃত হবে দেশের জনগন।