নরম কর্মসূচিতেও পাদপ্রদীপের আলোয় বিএনপি

বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নানা মহলে কথা হচ্ছে। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দৃষ্টি কেড়েছে। আর এ জন্যই এত আলোচনা। কিন্তু সরকার সেই আন্দোলনেও বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ। তাহলে বিএনপির আন্দোলন কতদিন শান্তিপূর্ণ থাকবে? আর সরকারও বা কতদিন এভাবে চলতে দেবে? তবে এতে যে বিএনপি ভালো প্রচার পাচ্ছে সেটি সবাই স্বীকার করছেন।

বিশ্লেষকরা কেউ কেউ এই অবস্থাকে বিএনপির জন্য শাপে বর অবস্থা হিসেবে দেখছেন। আর সরকার দলের জন্য দেখছেন উভয় সংকট হিসেবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন এটার লাভ লোকসানের হিসাব হবে আগামী নির্বাচনে। যা কিছু এখন রাজনীতিতে হচ্ছে তার লক্ষ্য নির্বাচন। দেখার বিষয় সেই নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপি ধৈর্য ধরতে পারে কিনা। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আরও কতদূর বিএনপিকে কোণঠাসা করতে পারে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যান গত ৮ ফেব্রুয়ারি। তিনি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে। মামলায় খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিল করা হলেও এখনো জামিন মেলেনি। গতকাল রবিবার হাইকোর্টে জামিনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা থাকলেও মামলার নথি যথাসময়ে না আসায় আদেশ হয়নি। রবিবার বিকালে অবশ্য মামলার নথি হাইকোর্টে যায়। সোমবার আদেশ দেওয়া হতে পারে। আর আপিলের কারণে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা স্থগিত আছে।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরদিনই থেকেই বিএনপি প্রতিদিনই ঢাকাসহ সারাদেশে নানা ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি দিচ্ছে। এর মধ্যে অনশন, অবস্থান এবং মিছিল সমাবেশ অন্যতম। আর ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের এলাকাকেই তারা কর্মসূচি পালনের মোক্ষম জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও তারা কিছু কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু প্রতিটি কর্মসূচিই কোনো না কোনোভাবে বাধার মুখে পড়ছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে আটক করা হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের। আর ২২ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চেয়েও পায়নি বিএনপি।

গত মঙ্গলবার কর্মসূচি চলাকালে প্রেস ক্লাবে ঢুকে অস্ত্র উঁচিয়ে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবুকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরদিন বৃহস্পতিবার ছাত্রদল নেতা মিজানুর রহমানকে রীতিমতো টেনেহিঁচড়ে পুলিশ প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে আটক করে নিয়ে যায়। বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরও টানাহেঁচড়ার শিকার হন। বিএনপি ১৪ ফেব্রুয়ারি তাদের অনশন কর্মসূচি নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করে দেয় পুলিশের অনুরোধে।

পুলিশ দাবি করছে, বিএনপি সড়ক দখল করে জনসাধারণের চলাচলে বাধা দিয়ে কর্মসূচি পালন করায় তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। জবাবে বিএনপি বলছে, তারা রাস্তার পাশে কর্মসূচি পালন করছে, রাস্তা বন্ধ করে নয়। অভিযোগ করছে, সরকার তাদের কেন সমাবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। রাস্তার পাশেও দাঁড়াতে দিতে চায় না।
এ ঘটনাগুলোর যুৎসই ব্যাখ্যা সরকারি দল দিতে পারেনি। বিএনপির একজন নেতা বললেন, সরকার আগ্রাসী আচরণ করতে থাকলেও তারা এভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তিনি একটি গল্প বলে বললেন, সরকারকে যদি বলা হয় বিএনপি তাহলে কী করবে। সরকার বলবে ‘কী’ করতে পারবে না বিএনপি।

দেশের বড় দুই দলের এই রাজনৈতিক আচরণের ব্যাখ্যা কী? আর পরিণতিইবা কী? জবাব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ। তিনি একটি বিদেশি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি যে আন্দোলন নিয়ে মঠে নেমেছে তাতে তারা দুই দিক থেকে লাভবান হচ্ছে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়াকে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। এখানে একটা সহানুভ‚তি পাচ্ছে বিএনপি। আর সাধারণ মানুষ সহিংস নয়, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন পছন্দ করেন। বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। এটা করতে দিলেও সরকারের সমস্যা। কারণ নির্বাচনের আগে বিএনপি এই ইস্যুতে মাঠে তাদের কর্মীদের চাঙ্গা রাখছে, সংগঠিত করছে। আবার সরকার বাধা দিলেও বিএনপি সাধারণ মানুষের সহানুভ‚তি পাবে। এরই মধ্যে বিষয়টি আলোচিতও হচ্ছে যে বিএনপির সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু শাসক দল এবং তাদের জোটের শরিকরা নির্বিঘ্নে সভা-সামবেশ করছে।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ায় সরকার উভয় সংকটে পড়েছে। আর বিএনপির জন্য হয়েছে শাপে বর।’

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি মনে করি নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে বিএনপির এই আন্দোলনের গতি আরও বাড়াবে। নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। অন্যদিকে এই পরিস্থিতিতে শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হতাশ হতে পারেন। কারণ যে উদ্দেশ্যে কিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে তার ফল তারা নাও দেখতে পারেন। আর বিএনপির আন্দোলন কতদিন শান্তিপূর্ণ থাকবে এবং সরকার কতদিন এই আন্দোলন চলতে দেবে তা সময়ই বলে দেবে।’

রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহম