তরমুজে খুশি জোয়ারে ভয়

বছর বছর ক্ষেতে তরমুজের বাম্পার ফলন হয়। বাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে এভাবেই তলিয়ে যায় তরমুজ। এবারও সে শঙ্কায় আছেন চাষিরা। ফাইল ছবি

অ- অ অ+
মতিন মিয়া ধানের কৃষক। কিন্তু ভাগ্যোন্নয়নের আশায় আবাদ পরিবর্তন করে তরমুজ চাষে ঝোঁকেন।

তরমুজ আবাদেই এখন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। প্রতিবছর তরমুজের নজরকাড়া ফলনও হয়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। সর্বনাশা জোয়ার বেশির ভাগ মৌসুমে তাঁর স্বপ্ন ডুবিয়ে দেয়। ফলে অভাব আর ধারদেনা পিছু ছাড়ে না কৃষক মতিনের। তিনি বলেন, ‘তরমুজে ভালো লাভ। এই নদীর (আগুনমুখা) পারে যদি বেরিবান (বেড়িবাঁধ) থাকতে তাহেলে আমার তরমুজে প্রত্যেক বচ্ছর ব্যামালা (অনেক) টাহা লাভ অইতে। আমার সংসারের উন্নতি অইতে। অভাব থাকতে না। আমাগো কতা সরকার যদি চিন্তা কইরগা বেরি কইরগা দেতে তাহেলে অনেক তরমুজ বেশি অইতে।

কৃষকরা লাভবান অইতে। আমরা খাইয়া-পইরগা ভালো থাকতে পারতাম। ’ প্রায় এক যুগ ধরে তরমুজ চাষ করা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কাউখালী গ্রামের তরমুজ চাষি মতিন মিয়া এভাবেই বলছিলেন। তিনি আরো বলেন, ‘দুই বচ্ছর আগে আমার কোনো লাভ অয় নাই। লাখ লাখ টাহা লোকসান দিছি। সবই জোয়ারে ভাসাইয়া লইয়া গ্যাছে। ’
জোয়ার শুধু তাঁর তরমুজেই আঘাত হানে না। দুই বছর আগে একই ইউনিয়নের চর ইমারশর গ্রামের রিয়াজ হাওলাদারের আবাদ করা ৩০ একর জমির তরমুজ জোয়ারে ভাসিয়ে নেয়। তিনি বলেন, ‘জোয়ার তরমুজ চাষি গো লইগ্যা অভিশাপ। চাষ করা সব জমিতে বেরিবান থাকলে কৃষক বাঁচতে। ’ প্রায় একই বক্তব্য চরগঙ্গা গ্রামের মো. তারেকের। বেড়িবাঁধের অভাবে প্রতিবছর শত শত কৃষকের তরমুজ জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কৃষকদের লোকসান গুনতে হয় কয়েক শ কোটি টাকা।

জেলার রাঙ্গাবালী, গলাচিপা ও বাউফলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার প্রধান ফসল ছিল ধান আবাদ; কিন্তু সেখান থেকে কৃষকরা বেরিয়ে এসেছে। ১২ থেকে ১৪ বছর আগে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর প্রথম তরমুজ আবাদ শুরু হয়। মাটি, পানি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়। লাভ বেশি, তাই তরমুজ চাষে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে সব উপজেলার কৃষকের মধ্যে। ফলে কয়েক বছর ধরে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী, গলাচিপা, কলাপাড়া ও বাউফলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ করা হয়। পটুয়াখালীর সব উপজেলা তেঁতুলিয়া, রামনাবাদ, লোহালিয়া, পায়রা, বুড়াগৌরঙ্গ, দাড়চিরা ও আগুনমুখা নদীতীরবর্তী। এ কারণে তরমুজ আবাদের পর পুরো ফলন আসার আগেই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শুরু হয় জোয়ারের প্রভাব। বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে জোয়ারের পানি এবং একই সঙ্গে লবণপানি ক্ষেতে ঢুকে কৃষকের আবাদ করা তরমুজ তছনছ করে দেয়। ফসল রক্ষায় বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে কৃষকের কয়েক শত কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়।

এ অঞ্চলে তরমুজ আবাদ শুরু হওয়ার পর ১৩ থেকে অধিক ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে ১৩ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। উল্লিখিত উপজেলার কৃষকের দাবি অনুযায়ী প্রতিবছর মৌসুমের অর্ধেক সময় পার হওয়ার পর জোয়ারের পানি আসতে শুরু করে। কৃষকরা এ দুর্যোগ থেকে রেহায় পেতে নদীতীরবর্তী সব কৃষিজমিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি করেন।

সরেজমিনে গত শুক্রবার বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, তেঁতুলিয়া নদীতীরবর্তী শত শত হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। ফলনও বেশ ভালো। কিন্তু কৃষকের চোখে-মুখে আতঙ্ক। চর ব্যারেটের কৃষক মো. রহমত আলী ব্যাপারি প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করে সাত একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। ফলন দেখে তাঁর মুখে হাসি ফুটেছে; কিন্তু শঙ্কা জোয়ারের পানি নিয়ে। তিনি বলেন, ‘গুরাগ্যারার ল্যাহাপড়া, আমার সংসার, আয়, লাভ—সবই এই ক্ষ্যাতে। জোয়ার না অইলে ভালো লাভ অইবে। আর জোয়ার দ্যাহা দেলে এবার আরো দেনায় জড়াইয়া পড়মু। ’ তিনি আরো বলেন, ‘গত বছর দুই লাখ টাহা খরচ কইরগা তরমুজ লাগাইছিলাম। একটা তরমুজও ব্যাচতে পারি নাই। সব জোয়ারের পানিতে ভাসাইয়া লইয়া গ্যাছে। ’ চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. এনামুল হক আলকাস মোল্লা বলেন, ‘চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের সবটুকুই নদীর মাঝখানে। এখানে যেকোনো ফলনই ভালো হয়। শুধু ধান ছাড়া আর সব ফসল জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ইউনিয়নের চারদিকে বেড়িবাঁধ থাকলে কৃষকের সব ধরনের ফসল রক্ষা পেত। এমনকি শুধু চন্দ্রদ্বীপের তরমুজ দিয়ে দেশের বেশির ভাগ চাহিদা মেটানো যেত। আর কৃষকও লাভবান হতো কয়েক গুণ। ফসলের উত্পাদন বাড়ানোসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনমানের উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের উচিত চন্দ্রদ্বীপের চারপাশে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে দেওয়া। ’

পটুয়াখালীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হৃদয়েশ্বর দত্ত বলেন, ‘উপকূলীয় এ জেলায় জোয়ার শুধু তরমুজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। সব ফসলের জন্য অভিশাপ। নদীবেষ্টিত এ জেলার সব উপজেলা বেড়িবাঁধের আওতায় নিয়ে আসা গেলে কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব হতো। ’ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহাবুব রব্বান