নোমান মাহমুদঃ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন রুরাল ওয়াটার সাপ্লাই প্রোগ্রামের ২ কোটি ৩০ লক্ষ্ ৭৭ হাজার টাকা ব্যায়ে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বায়রা ইউনিয়নে নির্মিত বায়রা ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলেও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীন দ্বন্দের কারনে বিশুদ্ধ খাবার পানি থেকে  বঞ্চিত হচ্ছে শত শত পরিবার।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ঢাকা সার্ভিস কোম্পানীর অভিযোগ, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দেওয়ান জিন্নাহ’র অনৈতিক দাবির কারনে প্রকল্প পরিচালনায় বাধাগ্রস্থ্ হচ্ছে তাদের কার্যক্রম। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে করা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বায়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান জিন্নাহ দাবি করেন, অনৈতিক বা উৎকোচ দাবি নয়, প্রকল্পের সিডিউল অমান্য করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করায় প্রকল্পের কাজের বিলের কাগজে স্বাক্ষর করেননি তিনি। আর এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গত ২০শে জুন প্রকল্পের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। যার দরুন খাবার পানি সংকটে পড়ে প্রায় ৪০০ পরিবার।

বিগত ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগীতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের যে সকল প্রত্যন্ত  অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে, সেই সকল অঞ্চলে গভীর নলকুপ স্থাপনের মাধ্যমে সাধারন মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে গভীর নলকুপ স্থাপনের এই কার্যক্রম শুরু করে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন এই প্রকল্পের মোট ব্যায়ের ৭০ শতাংশ অর্থায়ন করছে বিশ্ব ব্যাংক। বাকি ৩০ শতাংশ অর্থ স্পন্সর তথা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। চুক্তি মোতাবেক এর বিনিময়ে প্রকল্পের কাজ শেষে প্রকল্পে ৩০ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ ১২ বছর প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে এর থেকে অর্জিত অর্থ দ্বারা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ উত্তোলন করবে। ১২ বছর পর এর তত্ত্বাবধান, রক্ষনাবেক্ষন ও পরিচালনার  দায়িত্বে থাকবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ১১ সদস্য বিশিষ্ট পানি সরবরাহ কমিটি। আর এটি পরিচালনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ উভয়ে ব্যার্থ হলে সংশ্লিষ্ট জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এটি পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। প্রতিটি প্রকল্পে মোট ১২শ পরিবারকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ২টি করে গভীর নলকুপ খনন করা হয়েছে। যার একেকটির গভীরতা ৫০০ থেকে ৬০০ ফুট পর্যন্ত।

এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটির কাজ ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারনে নির্দিষ্ট সময়ের পরেও প্রকল্পের কাজ শেষের সময় বারবার দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। একই সময়ে শুরু হওয়া মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলায় অবস্থিত অন্য একটি ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন করে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের মাঝে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। শুধুমাত্র বায়রা ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পটির সঠিক সেবা আটকে আছে চেয়ারম্যান ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীন দ্বন্দের কারনে। এই দ্বন্দ নিরসনে উভয় পক্ষের সাথে দফায় দফায় আলোচনা করেও কোন সমাধানে আসতে পারেনি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

এবিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিধান চন্ত্র দে আওয়ার নিউজ ২৪ ডটকম’কে বলেন, “প্রকল্পে অনিয়মের যেই অভিযোগগুলো করা হচ্ছে তা অযৌক্তিক। কেননা সার্বক্ষনিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তাছাড়া বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকেও প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করা হয়েছে। মূলত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় ইউপি চেয়াম্যানের দ্বন্দের কারনে এখন চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে। আর চেয়ারম্যান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কোন অনৈতিক দাবি করেছে কিনা তা আমার জানা নেই, তবে প্রকল্পের কাজে কোন ত্রুটি হয়নি।”

এদিকে হঠাৎ করেই পানি সরবরাহ বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, “পানি সরবরাহ বন্ধের খবর পাওয়ার পর আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি এবং বর্তমানে আবার তা সচল করা হয়েছে। তাছাড়া চুক্তি মোতাবেক যদি কোন কারনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১মাস প্রকল্প পরিচালনায় ব্যার্থ হয় তবে এটি পরিচালনার দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদকে দেওয়া হবে। তারাও যদি ব্যার্থ হয় তবে বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম চালু রাখা হবে। সাধারন মানুষকে কোনভাবেই সেবা বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। তবুও আমরা চেষ্টা করছি আলোচনার মাধ্যমে ঠিকাদার ও চেয়ারম্যানের মধ্যে চলমান এই অভ্যন্তরীন দ্বন্দের সমাধান করতে। যদিও তাদের মধ্যকার এই দ্বন্দের মূল কারন আমাদের জানা নেই, তবে ধারনা করছি মূলত উভয় পক্ষের সমন্বয় ও আন্তরিকতার অভাবেই এটি হচ্ছে। তবে আমরা আশা করবো জনসাধারনের স্বার্থের কথা চিন্তা করে তারা উভয়েই আন্তরিকভাবে তাদের মধ্যকার সমস্যা সমাধান করে এই প্রকল্পটিকে সামনে এগিয়ে নিতে সহযোগীতা করবে।”

অন্যদিকে এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে তারা অতিসত্তর চেয়ারম্যান ও ঠিকাদারের মধ্যকার সকল সমস্যা সমাধান করে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এলাকায় গ্রাহকদের মাঝে পানি সরবরাহের দাবি জানান। সেইসাথে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অভ্যন্তরীন দ্বন্দের কারনে যেন সাধারন মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন।