গ্যাস উৎপাদনে বিদেশী নির্ভরশীলতা, বাড়ছে ঝুঁকি

গ্যাস উৎপাদনে বিদেশী কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। পিছিয়ে পড়ছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। ১৯ বছরের ব্যবধানে দেশের মোট গ্যাসের উৎপাদন ৬০ শতাংশ চলে গেছে বিদেশী কোম্পানিগুলোর দখলে। যেখানে ১৯৯৮ সালের আগ পর্যন্ত দেশের গ্যাস উৎপাদনের পুরোটাই করত দেশীয় কোম্পানিগুলো। কিন্তু গত ১৯ বছরে তা কমতে কমতে এখন ৪০ শতাংশে নেমে গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস উৎপাদন বিদেশী নির্ভরশীলতা বাড়ায় বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকির পরিমাণ। তাদের অবৈধ শর্ত মেনে না নিলে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। বলা চলে দেশ জিম্মি হয়ে পড়ছে বিদেশী কোম্পানিগুলোর ওপর।
গ্যাস উৎপাদনে পেট্রোবাংলার এক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালের আগ পর্যন্ত দেশের চাহিদার পুরো গ্যাস উৎপাদন করত দেশের জাতীয় তিন কোম্পানি। কিন্তু ১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জির মাধ্যমে দেশের গ্যাস সরবরাহে বিদেশী কোম্পানির কার্যক্রম শুরু হয়। ওই বছর সমুদ্রবক্ষে আবিষ্কৃত সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু করে কোম্পানিটি।
২০০৪ সালে দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনে ৭৬ শতাংশ অবদান ছিল দেশীয় কোম্পানিগুলোর। তখন ২৪ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন করত বিদেশী কোম্পানিগুলো। সাত বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১১ সালে গ্যাস উৎপাদনে দেশীয় কোম্পানিগুলোর অবদান কমে নেমে আসে ৪৮ শতাংশ। আর বিদেশী কোম্পানিগুলোর অবদান বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ শতাংশে। গত মে শেষে গ্যাস উৎপাদনে বিদেশী কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যায় ৬০ শতাংশ। আর দেশীয় কোম্পানিগুলোর অবদান কমে নেমে আসে ৪০ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে তিনটি বিদেশী কোম্পানি গ্যাস উত্তোলন করত। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি কেয়ার্ন সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি শেভরন তিনটি গ্যাসক্ষেত্র যেমন, জালালাবাদ, মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি তাল্লো বাংগোরা গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করত।
ওই অর্থবছরে দেশের মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৫২ শতাংশ উৎপাদন করে এ তিনটি বিদেশী কোম্পানি। কিন্তু অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন করায় ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছর থেকে দু’টি বিদেশী কোম্পানি গ্যাস উত্তোলন করছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ গ্যাস উত্তোলন করছে শেভরন।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে যেখানে বিদেশী তিন কোম্পানি গ্যাস বিক্রি করে আয় করে তিন হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয় চার হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে গ্যাস বিক্রি করে বিদেশী দুই কোম্পানি আয় করে চার হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় চার হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশ বা চার হাজার ৬৫ কোটি টাকাই আয় করে শেভরন।
সমাপ্ত অর্থবছরে ১১ মাসের হিসেব চূড়ান্ত করেছে পেট্রোবাংলা। গত অর্থবছরেও আগের বছরের তুলনায় গ্যাস বিক্রি করে বাড়তি আয় করছে বিদেশী কোম্পানিগুলো।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দেশীয় কোম্পানিগুলোর গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাড়তি চাহিদা মেটাতে বিদেশী কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করতে বলা হচ্ছে। যেখানে উৎপাদন ক্ষমতার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ উৎপাদন করার কথা, সেখানে কোনো কোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে প্রায় শতভাগ। এর ফলে একদিকে বিদেশী কোম্পানিগুলো স্বল্প সময়ে বাড়তি উৎপাদন করে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নিচ্ছে, তেমিন গ্যাসের মজুদও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে যা আমাদের জন্য হুমকিস্বরূপই বলা চলে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, দেশীয় কোম্পানিগুলোর চেয়ে বিদেশী কোম্পানিগুলোর গ্যাস কূপের সংখ্যা ও উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে চলছে। যেভাবে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে তাতে সামনে গ্যাস উৎপাদনে বিদেশী কোম্পানিগুলোর অবদান আরো বেড়ে যাবে।
এর ফল কী হবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. বদরুল ইমাম বলেন, এর ফল ভালো হবে না। গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ বিদেশী কোম্পানিগুলোর হাতে চলে গেলে তারা সময়ে সময়ে নানা শর্তের বেড়াজালে ফেলে দেবে। শর্ত না মানলে উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, এ থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয় কোম্পানি বাপেক্সকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে হবে। বাড়াতে হবে গ্যাস উৎপাদন।