গণপরিবহনে যাতায়াতে যৌন হয়রানির শিকার ৯৪ শতাংশ নারী

বাংলাদেশে গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্যান্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।রাস্তা থেকে শুরু করে গণপরিবহনে ভ্রমণ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা আর তদারকির অভাবকে যৌন হয়রানির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার ( ০৬ মার্চ) বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ত ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সমন্বয়ক হাসনে আরা বেগম এবং ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গর্ভনেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এর গবেষণা সহযোগী কবিতা চৌধুরী।

২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে এ গবেষণারটির জরিপে ৩৫৭ জন নারী অংশ নেন। আর গুণগত গবেষণায় ২৯ জন করে নারী ও পুরুষ অংশ নেন। ঢাকার মতিঝিল, মহাখালী, বনানী, মিরপুর ও কল্যাণপুর, গাজীপুর ও সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের খাগান গ্রামের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কর্মজীবী নারী ও গৃহিনী- যারা প্রতিনিয়ত গণপরিবহন ব্যবহার করেন তাদের নিয়ে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এছাড়াও ২৯ জন পুরুষ যাত্রী, বাস, টেম্পো ও সিএনজিচালক ও চালকের সহকারীরও সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ নারী বাস, টেম্পো বা সিএনজিতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে টেম্পোতে যাতায়াতকারীরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও পথচারী ২৬ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের কথা বলেছেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ নারীই (৬৬ শতাংশ) জানিয়েছেন, তারা ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সমন্বয়ক হাসনে আরা বেগম বলেন, “অশালীন বা পীড়নমূলক ভাষার মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন ৬৮ শতাংশ নারী। “৮১ ভাগ নারী বলছেন, যে তাকে চেনে না সে তার দিকে অশ্লীল বা কুদৃষ্টিতে তাকিয়েছে। বয়সভেদে এর কোনো পার্থক্য নেই। সব বয়সী নারীরাই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।” গবেষণায় দেখা গেছে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে অধিকাংশই অর্থাৎ ৮১ শতাংশ নারীই নিশ্চুপ থাকেন।

হাসনে আরা বেগম “যৌন হয়রানির শিকার হলে তাদের কিছু করার নেই বলেই তারা চুপ থাকেন। ৭৯ শতাংশ নারী আক্রান্ত হওয়ার স্থানটি থেকে সরে যান এবং ৫৫ শতাংশ নারী হয়রানিকারীকে আচরণটি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ১৪ শতাংশ নারী শারীরিকভাবে এ আচরণ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।” এছাড়াও ৪৬ ভাগ নারী নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য হিজাব ব্যবহার করছেন বলেও জানান এ গবেষক।

হাসনে আরা বেগম বলেন, “গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৪০ শতাংশ নারী কখনও না কখনও সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। চালকের অসতর্কতার জন্য ৬৮ শতাংশ, চলন্ত যান থেকে নামার সময় ১৩ শতাংশ, অপ্রশিক্ষিত চালকদের জন্য ২৫ শতাংশ নারী দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।”

নারীকে যৌন হয়রানি বন্ধ ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক নিশ্চিতে যুবসমাজ, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ বৃদ্ধি, সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনগণকে সংগঠিত করা এবং নীতিগত পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

পাশাপাশি সড়ক ও যানবাহনের নকশা, পরিবহন খাতে সেবা প্রদানকারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তদারকি নিশ্চিত করা এবং সড়ক ও পরিবহন ব্যবহারকারীদের নিরাপদ আচরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।

ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির প্রোগ্রাম প্রধান হাবিবুর রহমান বলেন, “দেশ যেহেতু এগিয়ে যাচ্ছে, তার মানে আমাদের নারীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে বলে সরকার কিন্তু গর্ব করে বলছে যে, আমাদের জিডিপি বাড়ছে। কিন্তু সে জায়গাটায় যদি যৌন হয়রানির কথা মাথায় রেখে নারীদের বাসা থেকে বের হতে হয়, তাহলে শুধু সড়কে নয়, যে কোনো জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে গোটা জাতির ক্ষতি হবে।”

পরিবহন খাতে সতর্কতা বাড়ানোর মাধ্যমে যৌন হয়রানি শূন্যের কোঠায় আনা, গণপরিবহনে নারীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণের জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা এবং যানবাহন চালনায় দ্রুত নারীদের নিয়ে আসার মাধ্যমে লিঙ্গ সংবেদনশীলতা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সমন্বয়ক নিশাত সুলতানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন- ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ সাদ আন্দালিব, ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক নাজমুল হোসেইন।