আসছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাতীয় নির্বাচন থাকায় কর নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাই করদাতাদের ওপর বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়েই নতুন বাজেট ঘোষণা করবেন তিনি। আবার ব্যবসায়ীদের খুশি করতে কমানো হতে পারে কর্পোরেট করের হার। তারপরও চলতি বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেট প্রায় ৯৭ হাজার কোটি টাকা বেশি হতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ জাতীয় সংসদে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে বাজেট প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী তার আকার হবে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। যদিও তার স্বপ্ন ছিল নিজের শেষ বাজেটের আকার হবে ৫ লাখ কোটি টাকা।নির্বাচনের আগে ভোটারদের সামনে উন্নয়ন দেখাতে বড় বড় প্রকল্পে এরই মধ্যে বরাদ্দ বেশি দেওয়া হয়েছে। বড় ১০ প্রকল্পের বরাদ্দই ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ভাতা যেমন বাড়ানো হচ্ছে, বাড়ছে সুবিধাভোগীর সংখ্যাও। নতুন বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের ৬৪ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা বেশি। আর চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এর আকার ৯৩ হাজার ৭৮ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেটের আকার তিন লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগামী বাজেটে তেমন কোনো পরিবর্তন আনছেন না তিনি। তবে আগামী বাজেট ৫ লাখ কোটি টাকা করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বাজেটের আকার চার লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার আশেপাশেই থাকবে।বাজেট প্রস্তাবের ছয় মাস পর জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে পুরো একটি অর্থবছরের বাজেট দিলেও অর্থমন্ত্রীর বড় নজর থাকবে মূলত প্রথম ছয় মাস।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নতুন বাজেটে জনগণের জন্য এটাই সবচেয়ে খুশির খবর যে, নতুন কোনো করারোপ করা হচ্ছে না। কর কর্মকর্তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের পাশাপাশি করদাতাদের হয়রানি কমাতে আইন-কানুন সংশোধন করা হয়েছে। তরুণরা করদানে উৎসাহিত হচ্ছে। তাই করহার না বাড়লেও নতুন অর্থবছরে বাড়তি করের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে তার আশা। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এমন কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে নির্বাচনকে মিলিয়ে দেখা যায়। আবার আগামী বাজেটে যে তেমন কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। এ থেকেও বুঝে নেওয়া যায় এটা নির্বাচনি বাজেট কি না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারাও বলছেন, বড় বাজেট করতে গেলে বড় রাজস্বের দরকার। দরকার রাজস্ব সংগ্রহের নতুন নতুন উৎস। নির্বাচনি বাজেট বলেই সরকার সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। মূলত নির্বাচনের কয়েক মাস আগে জনগণের ওপর বাড়তি কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করতে রাজি নয় সরকার। কিছু বিলাস পণ্যে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। ভ্যাটের স্তরের ৯টি থেকে পাঁচটিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে বাজেট প্রস্তাবে। এতে কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে সামান্য হারে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ছে। তবে ব্যক্তিশ্রেণির কর ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি কোনো করারোপ করা হচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদের মতে, ৯ বছরে বাজেটের আকার বৃদ্ধি ছাড়া বড় ধরনের নীতি সংস্কার হয়নি। এবারও আকারই বাড়ছে। তবে এখনো কর-জিডিপির নিম্নতম হার নিয়েই চলছে দেশ। চালু হয়নি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাও, যাতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতে পারত। অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে নিয়ে তিনি যে ‘নব উদ্যোগ বিনিয়োগ প্রয়াস’-এর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারও তেমন কিছুই হয়নি। গভীর কোনো অনুসন্ধান হয়নি ব্যাংক খাতের লুটপাট নিয়ে। ব্যয়ের চাহিদা মেটাতে অর্থমন্ত্রী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর থেকে দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এনবিআরকে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্য থেকে ৭১ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্য থেকে তা প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। এনবিআর কখনই রাজস্ব আদায়ে এত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত করব্যবস্থা থেকে ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা এবং কর ছাড়া প্রাপ্তি যেমন টোল, সরকারি হাসপাতালের ফিসহ অন্যান্য উৎস থেকে আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা।

বরাবরের মতো আগামী বছরও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট থেকে আদায় করতে হবে সবচেয়ে বেশি, ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এরপরই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আয়কর আদায় করা হবে ১ লাখ ২০০ কোটি টাকা। আর শুল্ক খাতে এনবিআরকে ৮৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যক্ষভাবে নতুন করারোপ না করে ব্যয়ের বাড়তি চাহিদা মেটাতে অর্থমন্ত্রীকে বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি রাখা হচ্ছে এক লাখ ১৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি)