কারাগারে জঙ্গিরা যেন কোনো ধরনের তৎপরতা চালাতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

মঙ্গলবার দুপুরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে কারা সপ্তাহ-২০১৮ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, কারাগারে কেবল অপরাধী নয়, রাজবন্দি হিসেবে অনেক নেতাকর্মীকে জেলে কাটাতে হয়। আমাদের জাতির পিতাকেও রাজনৈতিক কারণে ১৪ বছরের অধিক সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে। পৃথিবীর কোনো মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশই তাদের অপরাধী করে তোলে।

তিনি বলেন, জাতির দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতায় আমাদের জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়। রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে আমাকেও গ্রেফতার করা হয়। আমি ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলাম। তাই কারাগারের জীবন সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতাও কম নয়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, কারাগারে আগত বন্দিদের একটি বড় অংশ মাদক মামলায় আটক। এসব মাদকসেবী কিংবা মাদক ব্যবসায়ীরা যাতে কারাগারে থেকে মাদকসেবন বা মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারে তার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারা প্রশাসনের কেউ যাতে এসব অনৈতিক কাজে জড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারেও কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, একজন বন্দি যখন কারাগারে প্রবেশ করে তখন তার সব দায়দায়িত্ব কারা কতৃর্পক্ষের।

কারা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আবদুল হামিদ বলেন, কারা বিভাগে জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদের তুলে ধরার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কারাগারের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে পেশাগত দক্ষতা অর্জন। আর তা অর্জনে প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। রাজশাহীতে কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্মাণকাজের উদ্বোধন এবং কেরানীগঞ্জে আন্তর্জাতিক মানের ‘বঙ্গবন্ধু কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি’ স্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

কারা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বের কারাগারকে শাস্তি কার্যকরের স্থান নয়, সংশোধনাগার হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশ ও জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী যেন কারাগারের ভেতরে অভিনব কায়দায় জঙ্গি পরিকল্পনা বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে না পারে, সে বিষয়ে আপনাদের দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ জেলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও বন্দিদের অপরাধ প্রবণতা কমানোর উদ্যোগ সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে। বন্দির হাতকে দক্ষ কর্মীর হাতে রূপান্তরের জন্য কারাগারে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ অন্যতম। কারা শিল্পে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রয় করে লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ বন্দিদের প্রদান করার সিদ্ধান্ত একটি সময়োচিত পদক্ষেপ। সাজা শেষে কারা শিল্পে নিয়োগের ফলে লব্দ জ্ঞান এবং প্রাপ্ত লভ্যাংশের অর্থ কাজে লাগিয়ে তারা সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ পাচ্ছে। এতে সমাজে পুনঃপুন অপরাধ করার প্রবণতাও হ্রাস পাবে। এছাড়া কারাবন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করে তাদের পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার জন্য ‘মোবাইল ফোন বুথ’ চালু একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এসব পদক্ষেপের ফলে কারাবন্দিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পাবে বলে আমি আশা করি।

এর আগে রাষ্ট্রপতি বেলুন উড়িয়ে কারা সপ্তাহ ২০১৮ উদ্বোধন করেন। পরে তিনি সবুজ একটি জিপে চড়ে প্যারেড পরিদর্শন করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র সচিব (সুরক্ষা সেবা) ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন এবং কাশিমপুর কারাগারের জেলা সুপার ও জেলারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী।

অনুষ্ঠানে বেস্ট প্রডাক্টিভ জেল হিসেবে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারকে অ্যাওয়ার্ড (ক্রেস্ট) দেয়া হয়েছে। সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন ওই ক্রেস্ট গ্রহণ করেন।

এছাড়া কাশিমপুর কারাগার-২ এর ডেপুটি জেলার মাসুদ হোসেন, কুমিল্লার ডেপুটি জেলার শাহনাজ বেগম ও নরসিংদীর (সাবেক) ডেপুটি জেলার তানিয়া জামানকে অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস, বান্দরবান জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার রিজিয়া বেগম বেস্ট লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড, মহিলা কারারক্ষী তারানা পারভীনকে বেস্ট ইনস্ট্রাক্টরের পুরস্কার (ক্রেস্ট) দেয়া হয়েছে।

সোমবার দুদিনের সফরে গাজীপুরে যান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এদিন গাজীপুর জেলা শহরে শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে বীর ও শহীদদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।