পঞ্চগড় প্রতিনিধি
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার উভয় পাশে জড়ো হলেন কয়েক হাজার বাঙালি। রোববার সকালে তারা কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি বিনিময় করলেন নানান উহার সামগ্রী। দীর্ঘদিন পর স্বজনদের কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।
প্রতি বছরের মত এবারও পঞ্চগড়ে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের বাঙালিদের এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এবারই প্রথম জেলা প্রশাসন, বিজিবি এবং বিএসএফের সমন্বয়ে এই মিলন মেলার আয়োজন করা হয়।
সকাল থেকে সদর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত জেলার তেঁতুলিয়ার সীমান্তে মিলিত হন নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
পঞ্চগড় ও নীলফামারী বিজিবি জানায়, সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন তেঁতুলিয়া উপজেলার ভুতিপুকুর সীমান্তের মেইন পিলার ৭৩৪ এর ৬ নম্বর সাব পিলার এলাকা থেকে ৪ নম্বর সাব পিলারের ৫০০ গজ, নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন একই উপজেলার ভারতীয় শুকানী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪১ এর ৬ নম্বর সাব পিলার সংলগ্ন ৪০০ গজ, মাগুরমারী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪২ এর ১১ নম্বর সাব পিলার থেকে ১২ নম্বর সাব পিলার সংলগ্ন ৩০০ গজ এবং সদর উপজেলার অমরখানা সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪৩ এর ৩ নম্বর সাব পিলার থেকে মেইন পিলার ৭৪৪ এর ২ নম্বর সাব পিলার পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ গজ এলাকা জুড়ে এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
মেলা চলাকালীন এপারে বিজিবি ও পুলিশ সদস্য এবং ভারতের ওপারে বিএসএফের পাশাপাশি ভারতীয় পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে।
সকাল হতে না হতে মিলন মেলায় পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও টাংগাইল, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার নারী, পুরুষ সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে যান। একই সময় ভারতের কুচবিহার, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো হন কয়েক হাজার মানুষ।
দুপুরের মধ্যে কাঁটাতারের উভয় পাশে জড়ো হন দুই বাংলার কয়েক হাজার মানুষ। তারা একে অন্যের আত্মীয়। দীর্ঘদিন পর কাছের মানুষদের দেখতে পেয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক গলিয়ে একে অন্যের হাত ধরেন, কথা বলেন।
মিলন মেলায় ঠাকুরগাঁও সেক্টর কমান্ডার কর্নেঁল মোহাম্মদ শামছুল আরেফীন, পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আল হাকিম মো. নওশাদ, নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিন থেকে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এমন মিলন মেলা হলেও পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি এবং নীলফামারী ৫৬ বিজিবি’র পক্ষ থেকে এবারই প্রথম মেলায় আগতদের মধ্যে খাবার পানি, খাবার স্যালাইন বিতরণসহ প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের জগন্নাতপুর ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের ষাটোর্ধ হর মহন রায় সীমান্তে সমকালকে বলেন, ‘ভারতের জলপাইগুড়ি এলাকায় আমার ছোট ভাই প্রহল্লাদ চন্দ্র থাকে। তাকে দেখার জন্য এসেছি। খবর পেয়ে সেও এসেছে কাঁটাতারের ওপারে। আমাদের দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। প্রতি বছর একবার এভাবেই আমরা দেখা করি।’
একই জেলার পীরগঞ্জ এলাকার সিনোতি রানী বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। পাসপোর্ট ভিসা করে ভারতে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমার ভাই সুবোল রায় খুব ছোটবেলায় ভারতে চলে যায়। তাকে দেখতে এখানে এসেছি।’
পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আল হাকিম মো. নওশাদ বলেন, ‘এবারই প্রথম জেলা প্রশাসন, বিজিবি এবং বিএসএফের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগতদের মাঝে আমরা খাবার পানি, খাবার স্যালাইন বিতরণ করছি। এছাড়া মিলন মেলায় বিজিবির পক্ষ থেকে জরুরি স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।’
নীলফামারি ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মিলন মেলায় পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও টাংগাইল, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার মানুষ সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে যান। একই সময় ভারতের কুচবিহার, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভারতীয়রা জড়ো হন ওপারে। তারা একে অপরের সাথে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি উপহার সামগ্রী বিনিময় করেন।’
এদিকে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বিভিন্ন সীঁমান্তেও দুই বাংলার মানুষের মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।