ওজন ১৫০ কেজি… কাঁপালেন ফ্যাশন দুনিয়া

0
347
print
মোটা মডেল। মানে সোনার পাথরবাটি। অন্তত এ দেশের ফ্যাশন দুনিয়ায়। দুনিয়া যা-ই ভাবুক। দেশের সেই বাঁধা চিন্তাধারায় এবার আঘাত। মুম্বই ফ্যাশন উইকে প্লাস সাইজ মডেলদের র্যাম্প আগমন। যাঁরা আপনার মতোই মানুষ। গৃহিণী, ছাত্রী, ব্যবসায়ী। আপনিও তো স্বপ্ন দেখতে পারেন। লিখছেন দেবলীনা ঘোষ মুখোপাধ্যায়

সেই গানটা মনে আছে নিশ্চয়ই? আরে, হ্যাঁ সেটাই। পুরনো জিন্স, টি-শার্ট গায়ে না আঁটলে, মা কম জাঙ্ক ফুড খেতে বললেই যেটা গেয়ে ফেলতেন দু’ কলি—‘আমাকে মোটা বোলো না’। কিন্ত্ত ওই গাওয়াই সার। তাই বলে কি আজ পর্যন্ত থামাতে পেরেছেন কাউকে? বয় ফ্রেন্ড বাদ দিন। বেস্ট ফ্রেন্ডও কি ছেড়েছে আপনাকে?

তবে বলতেই হবে, ওজন যদি আপনাকে থামিয়ে দেয় সেই সংকীর্ণতা কিন্ত্ত আপনারই। ‘প্লাস সাইজ’ হয়েও আপনি সবরকম পোশাকই পরতে পারেন। শুধু প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসের। আগামী ‘ল্যাকমে ফ্যাশন উইক’-এ এরকম কয়েকজন ‘প্লাস সাইজ’ মডেল র্যাম্প কাঁপাতে চলেছেন। মুম্বইয়ের এই বিখ্যাত ফ্যাশন উইক-এ এই প্রথম প্লাস সাইজ মডেলরা হাঁটবেন। তাও ওয়েন্ডেল রডরিক্স-এর পোশাকে। কেমন ছিল তাঁদের যাত্রাপথ? শুনে নিন তাঁদের কাছ থেকেই…

কেজলিন খোলি, বয়স: ২২, অরুণাচল প্রদেশ

অরুণাচলের প্রথম মডেল কেজলিন। তাঁর প্রদেশ থেকে কেউ কখনও এর আগে মডেলিং করেননি। পড়তে এসেছিলেন মুম্বইয়ে। তারপর সেখানেই চাকরি। ইমেজ আর এটিকেট কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেন তিনি। ইটানগর থেকে মুম্বই—যাত্রাটা মোটেই সহজ ছিল না। কেজলিন জানাচ্ছেন, ‘একে মেয়ে তারপর মোটা। ফলে চেহারা নিয়ে কথা শুনতে হয়েছে অনেক। কিন্ত্ত ইমেজ কনসালটেন্ট হিসেবে আমি সবাইকে বলি নিজের শরীরকে ভালোবাসো। ওজন কখনও কোনও কিছুর অন্তরায় হতে পারে না। নিজেও মনে প্রাণে সেটাই বিশ্বাস করি। ‘ ভবিষ্যতেও মডেলিং করার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর। এবং ওজন না কমিয়েই।

ফিজা খান, বয়স: ২২, মুম্বই

১৬-১৭ বছর বয়সে জিরো সাইজ মডেল হিসেবে র্যাম্পে হাঁটতেন তিনি। কিন্ত্ত তারপর নানা কারণে ওজন বাড়তে থাকে। কিছুটা হতাশা আবার কিছুটা একেবারে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দুইয়ে মিলে এখন ওজন ১৫০ কেজি। আইনের এই ছাত্রী কিন্ত্ত তাও র্যাম্প ছাড়েননি। ‘এখন আমি প্লাস সাইজ মডেল হিসেবেই স্বচ্ছন্দ্য। তবে ওজনটা একটু কমাতে চাই। কারণ বেশি ওজনে খুব কষ্ট হয়। অতিরিক্ত মেদ কিছুটা ঝরে গেলেই আমি খুশী। আর জিরো সাইজ নয়, কার্ভি মডেল হিসেবে র্যাম্পে হাঁটতে চাই। আমি আফগানী। তাই স্ট্রাকচারটাও চওড়া। সেইভাবেই নিজেকে রাখতে চাই’, জানাচ্ছেন ফিজা।

অদিতি মুনি, বয়স: ৩৮, মুম্বই

তিনি হোমমেকার। দুই সন্তানকে নিয়ে দিব্যি কাটছিল জীবন। হঠাতই বিজ্ঞাপন দেখেন প্লাস সাইজ মডেল অডিশনের। একপ্রকার জোর করেই তাঁকে তাঁর সঙ্গী পাঠান এই অডিশনে। একদিকে বাড়ির রেনোভেশন চলছে, অন্যদিকে অডিশন, ফলে আর পাঁচজন মহিলার মতো প্রথমটাই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্ত্ত ভাগ্যও হয়তো একটু অন্যরকম পরিকল্পনা করে রেখেছিল। ‘বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। ইচ্ছেও ছিল অডিশন দেওয়ার। কিন্ত্ত বাড়িতে কাজ চলছিল। তারপর বাচ্চাদের স্কুল। একজনের বয়েস ৮, একজনের ৯। ফলে পুরো খেয়াল রাখতে হয় ওদের। আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। অডিশন শুরু হবে ১১টায়। এদিকে ১টার সময় বাচ্চাদের স্কুলের ছুটি।

হঠাত্ই নিখিল, আমার হাজব্যান্ড বলেন এই সব রোজকার ঘরোয়া কাজের জন্য এতবড় সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। ফলে ও বাড়ি সামলায়, আর আমি যাই অডিশন দিতে’—জানাচ্ছেন অদিতি। ফ্যাশন ডিজাইনিং-এর ছাত্রী অদিতি একসময় ওয়েন্ডেল রডরিক্স-এর কাছে ডিজাইনিং শিখেছেন। এবার তাঁর পোশাকেই র্যাম্পে হাঁটার পালা। ফলে স্বভাবতই উসিত তিনি।

রজত খান্না, বয়স:২৯, দিল্লি

রজত অনেক দিন ধরেই প্লাস সাইজ মডেলিং করছেন। বেশ কয়েকটা নামী ব্র্যান্ডের হয়েও মডেলিং করেছেন তিনি। তারপর হঠাত্ই ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখেন অডিশনের। আর দেরি করেননি। ব্যাগ গুছিয়ে সোজা পাড়ি দেন মুম্বই। রজতের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘বিজ্ঞাপনটা দেখেই আমি মুম্বইয়ে যাওয়ার ট্রেনের টিকিট কাটি। মুম্বইয়ে আমার কোনও পরিচিত কেউ থাকে না। একটা অনলাইন সাইট থেকে রুম বুক করি। অডিশন দিই। বেশ কষ্ট করতে হয়। তাই র্যাম্পে হাঁটার সুযোগটা আমার কাছে ছিল একেবারে গাজরের হালুয়ার মতোই সুস্বাদু। ‘ এই প্রথম কোনও নামী ডিজাইনারের হয়ে র্যাম্পে হাঁটবেন রজত। তেমন কাজের সুযোগ পেলে পাকাপাকি ভাবে মুম্বই থেকে যেতেও আপত্তি নেই তাঁর।

নেহা পারুলকর, বয়স: ২৫, মুম্বই

মোটা বলে ছোট থেকেই বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, ভাইবোনদের কাছে হাসির খোরাক হতে হয়েছে তাঁকে। কোনও পারিবারিক অনুষ্ঠানে কখনও যেতেন না তিনি। ওজনও অনেক। ১০০ কেজি। যাঁর সঙ্গেই দেখা হত, তিনিই জ্ঞান দিতেন রোগা হওয়ার জন্য। কিন্ত্ত তারপরেই বদলায় সব কিছু। একটি লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন সুইমসু্যট ইসু্য বের করছিল। সেখানে বিভিন্ন বডি টাউপের মডেল প্রয়োজন ছিল। এক বন্ধুর মাধ্যমে যোগাযোগ হয় সেই ম্যাগাজিনের সঙ্গে। ব্যস, তারপর বদলে যায় পুরোটা। ‘আমাকে যখন সুইম সু্যট শু্যট করার কথা বলা হয়েছিল আমি ভয়ে আর যোগাযোগ করিনি। কীভাবে আমি আমার থাই, মোটা হাত দেখাবো? আর স্টমাকও ফ্ল্যাট নয়! আমার পোশাকের সাইজ ২৪। কিন্ত্ত শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজি করিয়ে ফেলেন ওঁরা। আশ্চর্যের বিষয়, আমাকে একটুও দেখতে খারাপ লাগেনি। ইনস্টাগ্রামে আমি ছবিগুলো পোস্ট করি। খুব ভালো রেসপন্স পাই। কেউ বডি শেমিং করেনি। আর তারপরেই ডাক পাই ‘ল্যাকমে ফ্যাশন উইক’-এর অডিশনের। এখন আমাকে যদি কেউ মোটা বলেন, হেসে উড়িয়ে দিই। কারণ মোটা হয়ে যদি অন্যরকম কিছু করতে পারি তাহলে রোগা হতে যাব কেন?—প্রশ্ন নেহার।

প্রিন্স খুরানা, বয়স: ৩০, থানে

পারিবারিক ব্যবসা সামলান তিনি। সারক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয় ব্যবসার কাজে। ভবিষ্যতেও সেটাই করবেন। মডেলিং করার তেমন ইচ্ছেও নেই। তবুও বন্ধুরাই ধরেবেঁধে পাঠায় অডিশনে। কারণ একবার অন্তত র্যাম্পে হাঁটার ইচ্ছে ছিল তাঁর। ‘আমি কিছুই জানি না র্যাম্পের। কিন্ত্ত ইচ্ছে ছিল মডেলিং করার। তারপর আর হয়ে ওঠেনি। কিন্ত্ত বন্ধুদের জন্য সেই সুযোগ পাই। কেমন লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না। তবে এটাও ঠিক ভবিষ্যতে কোনও ভালো কাজের জন্য র্যাম্পে হাঁটতে হলে তাবেই হাঁটব। টাকার জন্যে নয়। তবে এখন নিজেকে ফ্যাশন উইকের জন্য তৈরি করছি মন দিয়ে’—জানাচ্ছেন প্রিন্স।

কিঞ্জল শাহ, বয়স: ৩২, মুম্বই

তিনি গান শেখান। মিউজিক কোঅর্ডিনেটর হিসেবেও কাজ করেন। অভিনয়ও করেন টুকটাক। তাই ফ্যাশন দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আগে থেকেই। ওজন নিয়ে কখনও মাথা ঘামাননি। কেউ বললেও পাত্তা দেননি। ‘আমাকে বহুবার বহু মানুষ বলেছেন ওজন না কমালে এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কিছু হবে না। নিজের শারীরিক গঠনের বিপরীতে গিয়ে কিছু করতেও চাইনি কোনওদিন। রোগা হলেই আমার কাছে কাজের বন্যা বইবে, এই মানসিকতা যাঁদের, তাঁদের জন্য সত্যিই দুঃখ হয়’—বক্তব্য কিঞ্জলের।

আশাকরি বুঝতে পারছেন ওজন কোনও কিছুরই অন্তরায় নয়। সুস্থ আর খুশী থাকাটাই আসল। তাই বাঁচুন প্রাণ খুলে। আর নিজেকে বলুন, বডি শেমিং? সেটা আবার কী?

ওয়েন্ডেল রডরিক্স: ‘ডিজাইনারের কাজই হল সব ধরনের বডি টাউপকে ভালোবাসা। এটাই ‘ফ্যাশন ডেমোক্রেসি’। তাই এবার প্লাস সাইজ পোশাক বানাতে পেরে আমি সত্যিই খুব খুশি। ফ্যাশন কোনও এক প্রকার মানুষের জন্য নয়। কোন বয়সে কে কোন রঙের পোশাক পরবেন, কোন ওজনে তিনি কী পোশাক বাছবেন এটা একেবারেই তাঁর ব্যক্তিরুচি। এই নিয়ে যাঁরা কথা বলেন তাঁরা কিন্ত্ত ফ্যাশনটা বোঝেন না। ফ্যাশন ডিজাইনারের কাজই হল স্বাভাবিক সৌন্দর্য্যটা বজায় রাখা।

LEAVE A REPLY