বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে নিজ বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর মহাখালী থেকে গাড়ি চালক আনছার আলীসহ নিখোঁজ হন বিএনপির এই প্রভাবশালী নেতা। ওইদিন মধ্যরাতে মহাখালী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলী ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার হলেও সন্ধান মেলেনি তাদের দুজনের।

দিন কিংবা মাস নয়, একে একে পেরিয়েছে ছয়টি বছর। তবে অপেক্ষার প্রহর এখনও ফুরায়নি। ইলিয়াস আলীর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি কোনও স্পষ্ট বক্তব্যও। তবে এখনও তার ফের আসার ব্যাপারে আশাবাদী পরিবার ও স্বজনরা। তাদের মতোই ইলিয়াসের ফেরার অপেক্ষায় দলের নেতাকর্মীরাও।

পরিবারের একটিই দাবি- তারা যে কোনো মূল্যে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলীকে অক্ষত এবং সুস্থ অবস্থায় তাদের মাঝে ফিরে পেতে চান। এ জন্য তারা দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।

ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদি লুনা বলেন, `সরকার আন্তরিক হলে ইলিয়াসকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কেননা গুম-নিখোঁজ হওয়া অনেক ব্যক্তি এরই মধ্যে তাদের পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। আমরাও বিশ্বাস করি, ইলিয়াস আলী একদিন ফিরে আসবেন। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইলিয়াসের অপেক্ষায় থাকব। এখন শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে ইলিয়াস আলীর ফিরে আসার পথ চেয়ে আছি।’

ইলিয়া আলী নিখোঁজের পর তাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে দেশব্যাপী কঠোর আন্দোলন গড়ে উঠে। আন্দোলন করতে গিয়ে ইলিয়াসের নির্বাচনী এলাকা বিশ্বনাথে প্রাণ হারান তিনজন। তৎকালে টানা কর্মসূচি পালন করে কেন্দ্রীয় বিএনপিও।

স্বামীকে উদ্ধারের আবেদন জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তখন ছুটে গিয়েছিলেন ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনাও। একইভাবে তিনি স্বামীর খোঁজ পেতে উচ্চ আদালতে একটি রিটও করেছিলেন। তবে কোনও কিছুরই কোনও অগ্রগতি নেই গত প্রায় অর্ধযুগে।

ইলিয়াসকে ফিরে পেতে প্রতিবছর নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে সিলেট বিএনপির নেতাকর্মীরা। এছাড়া বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে ইলিয়াস আলীকে অক্ষত অবস্থায় ফেরতের দাবি জানানো অব্যাহত আছে। প্রতি মাসেই দোয়া মাহফিলের আয়োজনও করা হচ্ছে ইলিয়াসের জন্য। জানানো হচ্ছে বিভিন্ন দাবিও।

ইলিয়াস আলীর মা সূর্যবান বিবি এখনও ছেলের ফেরার প্রতীক্ষায় বুক বেঁধে আছেন। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে মায়ের চোখের পানিও যেন শুকিয়ে গেছে।

ইলিয়াস আলী মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘ইলিয়াস আলী সরকারের হেফাজতে আছেন। আমরা আশাবাদী সিলেটবাসীর প্রিয় নেতাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ দাবিতে আমরা শুরু থেকেই প্রতিমাসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিলাম। তবে পুলিশের হয়রানির কারণে তা কিছুদিন অব্যাহত রাখার পর আর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। তবে নেতাকে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’

এদিকে, ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ছয় বছর পূর্তিতে স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের উদ্যোগেও আজ দুপুর ১২টায় নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা দাবি করেন, ‘বর্তমান সরকারই এম ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে। তার নেতৃত্বে টিপাইমুখ বাঁধের আন্দোলনে ভীত হয়েই দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তাকে গুম করে রেখেছে সরকার। দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকেও বন্দি করে রেখেছে জনবিচ্ছিন্ন সরকার।’ খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না বলেও জানান বক্তাদের।

জেলা ও মহানগরর বিএনপি আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে বক্তব্য রাখেন, সাবেক এমপি দিলদার হোসেন সেলিম, জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ, মহানগর বিএনপি সভাপতি নাসিম হোসাইন, সহসভাপতি ও সিসিকের প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়স লোদী ও বিএনপি নেতা আবদুল আহাদ খান জামাল।

এ সময় সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির কয়েকশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এরপর একই স্থানে ইলিয়াস মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

মানববন্ধন চলাকালে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা বলেন, ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ছয় বছর হয়ে গেলেও সরকার এখন পর্যন্ত তার খোঁজ দিতে পারছে না। তার বিপুল জনপ্রিয়তার কারণেই সরকারের মদদে তাকে গুম করা হয়েছে। দ্রুত ইলিয়াস আলীকে সবার মাঝে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান তারা।

এছাড়া ৬ বছর আগে নিখোঁজের এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বাদ যোহর হযরত শাহজালাল (রহ:) দরগাহ মাজার মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে সিলেট জেলা বিএনপি।

এদিন সকাল থেকে জেলার সকল উপজেলা ও পৌর শাখায় ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ইলিয়াস-রুশদি দম্পতির ২ ছেলে এখন লন্ডনে পড়াশুনা করছে। একমাত্র মেয়ে ঢাকায় অষ্টম গ্রেডে পড়াশুনা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া আশ্বাসের কথা স্মরণ করে রুশদির বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন, ইলিয়াস ফিরে আসবে, কিন্তু তার কোনো উদ্যোগ আমি দেখছি না। এ উদ্যোগের অভাব আমার পরিবারকে গভীর হতাশায় ঠেলে দিয়েছে। তারা অন্তত এটুকু বোঝে যে শেখ হাসিনা পরিবারের সবাইকে হারানোর ব্যথা অনুভব করতে পারেন। আমরা এখনো প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই ইলিয়াস আলীর সন্ধানে উদ্যোগ নিন। আমরা ভীষণভাবে তাকে ফিরে পেতে চাই।’