আরো একজন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত, কতটা ঝুঁকিতে থাকেন তারা?

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর কাজ কি দিন দিন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে শান্তিরক্ষীদের মধ্যে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের দেয়া তথ্য সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ সুদানে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার পথে অতর্কিত গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশে নৌ বাহিনীর লে. কম্যান্ডার আশরাফ সিদ্দিকী।
তিনি সেখানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে একজন লিঁয়াজো কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করছিলেন। হামলার সময় নেপালি শান্তিরক্ষী দলের সাথে ছিলেন তিনি।কম্যান্ডার সিদ্দিকীর মৃত্যুতে গত ৩০ বছরে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কর্মরত অবস্থায় নিহত বাংলাদেশীদের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৪৫। তাদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ১২৫ জন, পুলিশের ২০ জন। আহতের সংখ্যা ২২৪।গত তিন মাসের মধ্যে মারা গেছেন ৩জন।

১৯৮৮ সালে ইরাক ও ইরানের মধ্যে অস্ত্র-বিরতি পর্যবেক্ষণের সময় প্রথম জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অংশ হিসাবে বাংলাদেশীদের মোতায়েন করা হয়।তারপর থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশগ্রহণকারী দেশে পরিণত হয়েছে। এ মুহূর্তে ১০টি দেশে সাত হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী মোতায়েন রয়েছেন।

শান্তিরক্ষীদের বিপদ দিন দিন বাড়ছে জাতিসংঘের এক হিসাবেই বলা হচ্ছে, ২০১৭ সালে বিশ্বে মোট ৫৬ জন শান্তিরক্ষী মারা গেছেন। ১৯৯৪ সালের পর এক বছরে এত বেশি “ব্লু-হেলমেট” মারা যাননি।

শান্তিরক্ষীদের বিপদ বেড়ে গেছে কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত রেডিও এনপিআরের সাথে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সাবেক শান্তিরক্ষী কনোর ফলি দুটো কারণের কথা বলেছেন :এক, কয়েক বছর আগের তুলনায় পৃথিবীতে এখন অনেক বেশি সহিংস। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া এবং আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় সংঘাত বেড়েছে।দুই, বেসামরিক লোকজনকে রক্ষায় জাতিসংঘ এখন আগের চেয়ে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। ফলে, শান্তিরক্ষীরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।

বাংলাদেশী এক শান্তিরক্ষীর অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিমএম জিয়াউল হাসান একাধিকবার শান্তিরক্ষী মিশনে কাজ করেছেন। দক্ষিণ সুদানের পার্শ্ববর্তী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ইতুরিতে ২০১০-১১ সালে তিনি বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।তিনি বিবিসিকে বলেন, কিছু পন্থা অনুসরণ করলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

“সংঘাতের প্রতিদ্বন্দ্বী যে সমস্ত দল বা গোষ্ঠী থাকে, তাদেরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে হয় যে কাউকে আঘাত করা আমাদের লক্ষ্য নয়, আমাদের মূল উদ্দেশ্য বেসামরিক মানুষের জানমাল রক্ষা।”তিনি বলেন, অনেক সময় অনেক শান্তিরক্ষী এই সীমারেখা ভুলে নিজেদের বিপদগ্রস্ত করেন।

নিজের অভিজ্ঞতা উদ্ধৃত করে ব্রিগেডিয়ার হাসান বলেন, “রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতাম, আপনি স্থানীয় মানুষজনের সাথে যত যোগাযোগ রাখবেন তত বেশি নিরাপদ থাকবেন, তত বেশী তথ্য পাবেন, কোথায় কখন কোন ধরণের বিপদ আসতে পারে, সে সম্পর্কে আরো বেশি ওয়াকিবহাল থাকবেন।”

তিনি বলেন, চলাফেরা করার ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয়।তার অভিজ্ঞতা থেকে ব্রিগেডিয়ার হাসান বলেন, হামলাগুলো হয় সাধারণত দিনের বেলায়। “সুতরাং আমরা টহল বা ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য রাতের বেলা বেছে নিতাম।”
তবে তিনি স্বীকার করেন, সতর্ক হলেও ঝুঁকি থেকেই যায়। “তারা যে শান্তিরক্ষীদের সবসময় টার্গেট করে তা নয়, অধিকাংশ সময় মৃত্যু হয় গোলাগুলির মধ্যে পড়ে, বা পেতে রাখা মাইনে।”