প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন বাংলাদেশের জনগণ কখনো শোষিত-বঞ্চিত হবে না। তাই শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে জীবনের বেশির ভাগ সময় তাকে জেলে কাটাতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে আপনারা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আরো বেশি বেশি জানতে পারবেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মদিবস এবং জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ কমপ্লেক্সে আয়োজিত শিশু সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছোটবেলা থেকে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অভাবী ও দুঃখী মানুষের বন্ধু, তাই তিনি ছোটবেলা থেকে নিজের জামা-কাপড়, বই-খাতা গরীব বন্ধুদের দিয়ে দিতেন। গরীব মানুষকে বাড়ির ধানের গোলা থেকে ধান দিয়ে দিতেন। তিনি এ দেশের মানুষকে ভালবাসতেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ই মার্চের ভাষণ আজ জাতিসংঘের প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে। সারা বিশ্বের আড়াই হাজার বিখ্যাত ব্যক্তির ভাষণের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি পেয়েছে।

তিনি বলেন, মাত্র সাড়ে ৩ বছরে তিনি একটি যুদ্ধবিব্ধস্ত দেশকে পুনর্গঠনে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, ৭৫-র ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেদিন আমরা দুই বোন বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাই। ৬ বছর আমাদের শরণার্থী জীবন কাটাতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার একমাত্র চাওয়া বাংলাদেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে, তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে, তিন বেলা পেটভরে খেতে পারবে। আজ আমাদের জন্য একটি সুখবর আছে। জাতির পিতার জন্মদিনে এ সুখবরটা আপনাদের দিচ্ছি। আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো আগেই উন্নয়নশীল দেশ ছিল। আমরা তাদের থেকে পিছিয়ে ছিলাম।

প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় জাতির জনকের আন্দোলন-সংগ্রাম-ত্যাগ-তিতীক্ষার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পর জাতির জনক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন। তিনি চেয়েছিলেন, উন্নত-সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। কিন্তু, মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন তিনি। আরেকটু সময় পেলে বাংলাদেশ বহু আগেই উন্নত দেশে পরিণত হতো। কিন্তু জাতির জনককে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি। পঁচাত্তরের কালরাতে তাকে সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়।

শিশুদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। তারাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই আমি চাই, একটিও পথশিশু থাকবে না। তারা পড়াশোনা করবে, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিবে। মন ও শরীর ভাল থাকবে। মানুষের মতো মানুষ হবে।

অভিভাবক, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা শিশুদের খবর রাখবেন। তারা কোথায় যায় কী করে এসব বিষয়ে খবর রাখতে হবে। যাতে শিশুরা কোনো খারাপ কাজে জড়িয়ে বিপথগামী না হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, শিশুদের মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। আমরা শিশুদের বিনামূল্যে বই ও বৃত্তি দিচ্ছি। শিশুদের মায়েদের ভাতা দিচ্ছি। ৮০ হাজার প্রতিবন্ধীকে বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। যাতে তারাও মূলধারা থেকে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দেশকে ভিক্ষকমুক্ত করার জন্য কাজ করছি। তাদের পুনর্বাসন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। গৃহহীনদের বাড়ি-ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ২১ বছর পর আমরা ক্ষমতায় এসে দেশ গড়ার কাজ শুরু করি। কিন্তু ২০০১ সালে আমরা নির্বাচনে জয়ী হতে না পারায় দেশ আবার পিছিয়ে যায়। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমরা দেশের ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকায় বিশ্বের সাথে তাল-মিলিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ অতিথির ভাষণে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি শিশুদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের শিশুরা জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠবে, দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন শহরের সোনালীস্বপ্ন একাডেমির চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়ন্তী সাহা পিউ। সভাপতিত্ব করেন শহরের এস এম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আরাফাত হোসেন।

এ সময় মঞ্চে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম এনডিসি, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার এম বজলুল করিম চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথি তার ভাষণ শেষে চিত্রাঙ্কন, ৭ই মার্চের ভাষণ, গল্প বলা, রচনা প্রতিযোগিতা ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশুদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

পরে প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা দর্শক সারিতে বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। দুপুর ১টায় প্রধানমন্ত্রী ফিতা কেটে বইমেলার উদ্বোধন ও শিশুদের আঁকা আমার ভাবনায় ৭ই মার্চ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।

এর আগে শিশু সমাবেশ মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ রাসেল স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্তকরণ, আমাদের ছোট রাসেল সোনা শিশু গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়ার দুইজন মহিলার হাতে সেলাই মেশিন বিতরণ করেন।

বেলা ৩টায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।