আগুন লাগানোয় সক্রিয় ছিল তিন পুলিশ

0
240
print
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ সাঁওতাল পল্লীর বাড়ি-ঘরে আগুন লাগানোর ঘটনায় তিনজন পুলিশ সদস্য সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচারিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি এবং উক্ত ঘটনার সময়ে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য দায়ী। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। গতকাল সোমবার এফিডেভিট আকারে হাইকোর্টে প্রতিবেদনটি দাখিল করেছেন গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. শহিদুল্লাহ।

সূত্র জানায়, সাঁওতালদের বাড়ি-ঘরে আগুন লাগানো বিষয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল জাজিরা টেলিভিশনে প্রদর্শিত ভিডিও ক্লিপ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, কিছু পুলিশ সদস্য এবং দুইজন সিভিল পোশাকধারী ব্যক্তি সাঁওতালদের বাড়ি-ঘরে আগুন লাগানোয় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। আরো কিছু পুলিশ সদস্য কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন যারা আগুন লাগানোয় সক্রিয়ভাবে অংশ নেননি। তাবে তারা আগুন নেভানোর চেষ্টাও করেননি।

প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ দায়িত্বপালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা, ফার্মের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সংবাদকর্মী, ক্ষতিগ্রস্থ সাঁওতাল ও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের সাক্ষ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গ্রুপ সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের অফিসের ভেতর দিয়ে পশ্চিম দিকে চামগাড়ী         বিল নামক স্থানে সাঁওতালদের স্থাপনার দিকে গুলি করতে করতে এগুতে থাকলে সাঁওতালগণ তীর ছুড়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। তখন নিরাপত্তার অভাবে সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। রংপুর চিনি কলের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণও একই কারণে সাঁওতালদের স্থাপনার কাছে যেতে পারেননি। পুলিশের গুলির আওয়াজে আতংকগ্রস্থ হয়ে সাঁওতালগণ তাদের স্থাপনা ছেড়ে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে গ্রুপটি খামারের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করেছিল, তারাই চামগাড়ী বিল নামক স্থানে সাঁওতালদের নির্মিত স্থাপনার কাছে গমন করেছে। পেন ড্রাইভে প্রদত্ত ভিডিও ক্লিপসমূহ পর্যবেক্ষণে এবং ক্ষতিগ্রস্থ সাঁওতাল ও মসুলমান সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, চামগাড়ী বিল নামক স্থানে নির্মিত স্থাপনা থেকে সাঁওতালগণ চলে যাওয়ার পর আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশ, র্যাব ও ডিবির পোশাক পরিহিত সদস্য এবং সাধারণ পোশাকধারী দুই জন ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ওই গ্রুপটির মধ্য থেকে পুলিশ লেখা পোশাকধারী দু’জন, ডিবি লেখা পোশাকধারী একজন ও সাধারণ পোশাকধারী দু’জন (লাল ও সাদা রং এর শার্ট পরিহিত) ব্যক্তিকে সক্রিয়ভাবে চামগাড়ী বিল নামক স্থানে সাঁওতালদের স্থাপনায় আগুন লাগাতে দেখা গেছে। অপরদিকে কুয়ামারা, সাহেবগঞ্জ ও হরিণমারী এলাকায় সাঁওতালদের নির্মিত স্থাপনায় কতিপয় স্থানীয় লোক আগুন লাগিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুসন্ধানকালে আল জাজিরার ভিডিও ক্লিপটি ক্ষতিগ্রস্থ সাঁওতালগণসহ অন্যান্য সাক্ষীগণকে কম্পিউটারের পর্দায় দেখিয়ে অগ্নি সংযোগকারীদের সনাক্ত করতে বলা হলে কোন সাক্ষীই তাদেরকে সনাক্ত করতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ হেলমেট পরিহিত থাকায় এবং ভিডিও ক্লিপটি অনেক দূর এবং পিছন থেকে সংগৃহীত হওয়ায় উক্ত সদস্যদের মুখমণ্ডল দেখা যায় না। তবে তাদের পরিহিত পোশাকে পুলিশ, র্যাব ও ডিবি লেখা দেখা গেছে। কিন্তু সাক্ষীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উক্ত সদস্যদের নাম ও পদবীসহ সনাক্ত করতে পারেননি। সে কারণে অনুসন্ধানকালে আমি গাইবান্ধার পুলিশ সুপারের কাছ থেকে ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উক্ত সদস্যদের নামের তালিকা তলব করলেও তিনি নামের তালিকা সরবরাহ না করে তার কার্যালয়ের একটি স্মারকপত্র পাঠান।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চামগাড়ী বিল ও কুয়ারমারা নামক স্থানে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে। সাহেবগঞ্জ ও হরিণমারী এলাকায় আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে সন্ধ্যা আনুমানিক সাতটার পরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এবং হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি দেখে বসতি স্থাপনকারীগণ আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আগুন লাগানোর আগেই নির্মিত স্থাপনা থেকে আনুমানিক ৫০০-৬০০ গজ দূরে মাদরপুর ও জয়পুরগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলো মর্মে সাক্ষীদের বক্তব্যে সুস্পষ্ট হয়েছে। ফলে এরূপ প্রেক্ষাপটে সাক্ষীগণ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ আগুন লাগানোর ঘটনায় জড়িত স্থানীয় অপরাধীদের সুনিদ্দিষ্টভাবে সনাক্ত করতে পারেননি। তাছাড়া কোন কোন সাক্ষী তাদের জবানবন্দিতে আগুন লাগানোর ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলেও তাদের উপস্থিতির বিষয়টি বর্ণিত প্রেক্ষাপটে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ পোষাক পরিহিত থাকায় সাওতালদের স্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যদের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গত ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর সুগার মিলের অধিগ্রহন করা জমিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাওতালদের সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কিছু লোক হতাহত হয়। এ নিয়ে করা রিট মামলার রুলের শুনানির এক পর্যায়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)সহ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১৪ ডিসেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে কারা আগুন লাগিয়েছে এবং এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা তদন্তের নির্দেশ দেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃঞ্চা দেবনাথের ডিভিশন বেঞ্চ। ওই নির্দেশের প্রেক্ষিতে গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ক্ষতিগ্রস্থ সাঁওতাল ও মসুলমান সম্প্রদায়, সংসদ সদস্য, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, রংপুর সুগার মিলের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সদস্যবৃন্দ, পুলিশ সদস্য, গোবিন্দগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের ফায়ারম্যান ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণের জবানবন্দি গ্রহন করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু ইত্তেফাককে বলেন, ৬৫ পৃষ্ঠার মূল তদন্ত প্রতিবেদনের এক হাজার পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক কাগজপত্র দাখিল করেছে বিচারিক তদন্ত কমিটি। বিষয়টি আমাকে অবহিত করেছে। তবে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমি অবহিত নই।

সূত্রঃ ইত্তেফাক

LEAVE A REPLY