আগাম বাঙ্গি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন মাদারীপুরের কৃষকরা

0
24
print

মোনাসিফ ফরাজী সজীব,মাদারীপুর।
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের শত শত কৃষক বর্তমানে আগাম বাঙ্গি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আগাম বাঙ্গি চাষ করে লাভবান হচ্ছে মাদারীপুরের কৃষকরা। প্রতিবছর এখানকার আগাম বাঙ্গির ফলন ভাল হওয়ায় এবং বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় চাষীরা আগাম বাঙ্গি চাষে ঝুকে পড়েছে।
জানা গেছে,বিগত কয়েক বছরের ভয়াবহ বন্যায় মাদারীপুরের কয়েকশ হেক্টর আবাদী জমিতে বালুর স্তর পড়ায় কৃষকদের জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়।অনাবাদী হয়ে পড়ে শত শত হেক্টর জমি।বালু অপসারণ করে কৃষকদের ভাগ্যের চাকা বদলে দিতে শুরু করে আগাম বাঙ্গি চাষ।বাঙ্গি চাষে সফলতা আসতে শুরু করায় এ চাষে আবাদী জমির পরিমান ও কৃষকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতি বছরই লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে বাঙ্গি চাষ করে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা।
মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে,জেলার চারটি উপজেলায় এ বছর ১১০ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।এর মধ্যে রাজৈরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৩ হেক্টর জমি। ৪৩ হেক্টরের মধ্যে ৩৫ হেক্টরই চাষাবাদ করা হয়েছে রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নে।এ ইউনিয়নের সুতারকান্দি,গঙ্গাবদ্দী,নয়াকান্দি ও কোদালিয়া গ্রামের শতাধিক কৃষকসহ মাদারীপুরের আগাম বাঙ্গি চাষীরা ব্যাপক মুনাফা অর্জন করছে।বাঙ্গি চাষ করে সবারই অভাব দূর হয়েছে। অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগাম বাঙ্গি চাষাবাদ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এবছর বৃষ্টিপাতের কারনে বাঙ্গি চাষে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। অন্যান্য বছর অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ থেকে শুরু করে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে আগাম বাঙ্গির চাষাবাদের কাজ সম্পন্ন করা হয়।জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহ থেকে বাঙ্গি ফসল উঠতে শুরু করে।এ বছর আগাম বাঙ্গি ফসল জানুয়ারীর শেষ দিকে পুরোদমে উঠা শুরু করবে বলে কৃষক এবং কৃষি কর্মকর্তাদেও সাথে আলাপ করে জানা গেছে। বাঙ্গি উত্তোলনের কাজ চলবে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যšত। ৫২ শতকের প্রতি বিঘায় বাঙ্গি চাষে কৃষকের খরচ হচ্ছে ১৫/২০ হাজার টাকা। আবহাওয়া ভাল থাকলে এবং পোকা মাকড়ের হাত রক্ষা পেলে আগাম বাঙ্গি ফসলে বিঘা প্রতি প্রায় এক লাখ টাকা আয় হবে কৃষকদের কাছ থেকে জানা গেছে।ভালো ফলনের জন্য জমিতে নিয়মিত পানি,ডিআইবি সার, টিএসপি ও পটাস সার এবং পোকা-মাকড় মারার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়।এ অঞ্চলের একই জমিতে বাঙ্গিসহ তিন ফসল উৎপাদন হওয়ায় মানুষ নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন।কৃষি বিভাগও কৃষকদেরকে সার্বিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি,নয়াকান্দি ও গঙ্গাবর্দ্দী গ্রামের আগাম বাঙ্গি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রেতারা বিক্রি করে আসছে। এখানকার বাঙ্গি পাকানোর জন্যও কোন প্রকার ঔষধ বা কৃত্রিম কোন কিছু ব্যবহার করা হয় না বলে জানা গেছে। এখানকার আগাম বাঙ্গি বেশ সুস্বাধুও।বাঙ্গি ফসল উঠা শুরু করলে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে শতশত কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত আগাম বাঙ্গি বিক্রি করে থাকে।

বাজিতপুরের সুতারকান্দি গ্রামের আব্দুল আলিম ফকির জানান,তিনি ৫২ শতকের ৯বিঘা জমিতে আগাম বাঙ্গি চাষ করেছেন। তার প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। তার বিঘা প্রতি লাভ হবে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এ বছর তার জমিতে আসানুরূপ ভাল ফলন পাবেন বলেও তিনি আশাবাদী।কৃষি বিভাগ থেকে তাদেরকে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি এলাকায় আগাম বাঙ্গি চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটানোর জন্য ব্যাংক থেকে সুদমুক্ত কৃষি লোন দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
এ এলাকার বাঙ্গি চাষী কালু ফকির জানান, তিনি এ বছর ৫ বিঘা জমিতে আগাম বাঙ্গি চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় তিনি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভবান হবে বলে তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান। বাঙ্গি ফসল উঠা শুরু করলে প্রতিদিন তারা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পার্শ্বস্থ সুতারকান্দি চাতাল এলাকায় বাঙ্গির হাটে বেচা কেনা করে থাকেন। এচাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখান থেকে বাঙ্গি কিনে নিয়ে বিক্রি করছে।পরবর্তীতে সারাদিন তারা মহাসড়কের পাশে বসে বাঙ্গি বিক্রি করে থাকে।পুরো এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলবে বাঙ্গি উৎপাদন ও বিক্রির কাজ।
কামাল ফকির জানান,আগাম বাঙ্গি চাষ করে তিনি বেশ লাভবান হয়েছেন। বাঙ্গি চাষে ব্যাপক সফলতা পাওয়ায় তিনি গত বছরের চেয়ে এ বছর বেশী জমিতে আগাম বাঙ্গিও চাষাবাদ করেছেন। ক্ষেতে তার ফসলও ভাল দেখা যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
আগাম বাঙ্গি চাষে কৃষকদেরকে নিয়মিত পরামর্শকারী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পরিতোষ চন্দ্র বোস জানান, তিনি বাঙ্গি চাষে সফলতা আনার জন্য সার্বক্ষণিক কৃষকদেরকে সকল প্রকার পরামর্শ দান করে যাচ্ছেন।বৃষ্টির কারণে এ বছর আগাম বাঙ্গি চাষ কিছুটা বিলম্বে হলেও পলি ব্যাগে চারা উৎপাদন করে কৃষকদেরকে চাষাবাদে উৎসাহ যুগিয়েছেন।
রাজৈর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ কামরুজ্জামান জানান, বাঙ্গি একটি অর্থকারী ফসল। আগাম বাঙ্গি চাষ করে রাজৈরের বাজিতপুর ইউনিয়নের কৃষকরা ক্রমশ লাভবান হচ্ছেন।বাঙ্গি উৎপাদনে এবং পোকা-মাকড় দমনে কৃষকদের মাঝে সেক্সফেরোমন ফাদের ব্যবহার এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করায় কৃষকরা বিশমুক্ত বাঙ্গি উৎপাদন করতে সফল হচ্ছে। ফলনও হচ্ছে ভাল। এ এলাকার চাষীরা একই জমিতে তিনটি ফসল উৎপাদন করছে। এর মধ্যে বাঙ্গি উৎপাদনে তারা লাভবান হচ্ছেন বেশী।বাঙ্গি চাষে কৃষকদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য কৃষি বিভাগ সকল প্রকার সহযোগিতা করা হচ্ছে।

মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ জিএমএ গফুর জানান,জেলায় এ বছর ১১০হেক্টর জমিতে বাঙ্গি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শিবচর উপজেলায় ২০হেক্টর, রাজৈরে ৪৩ হেক্টর,কালকিনিতে ৫ হেক্টর ও মাদারীপুর সদর উপজেলায় ২ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি আবাদ করা হয়েছে।রাজৈর উপজেলায় যে বাঙ্গি চাষ করা হয়েছে, তা সবই আগাম বাঙ্গি। আগাম বাঙ্গি চাষের জন্য রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়ন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার মধ্যে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। আগাম বাঙ্গি একটি লাভজনক অর্থকারী ফসল হওয়ায় আবাদী জমি ও কৃষকরের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ব্যাপারে কৃষকদেরকে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY