আইন দূর্বল, নাকি দূর্বল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা

নোমান মাহমুদঃ দেশে সকল প্রকার অনিয়ম-অপরাধ দমনে সরকার বিভিন্ন সময়ে সংসদে সময়ের তাগিদে প্রচলিত আইনের সংস্কার করা সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর নতুন আইন প্রনয়ন করলেও এসকল আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের প্রশ্নে সাধারন মানুষের সংশয় যেন কাটতেই চায় না। সময়ের প্রয়োজনে কোন আইনকে যখন সংশোধনীর মাধ্যমে যুগোপযোগী করে তোলা হয় কিংবা নতুন কোন আইন প্রনয়ন করা হয় তখন সাধারন মানুষের মনে যেমন নতুন করে আশার সঞ্চার হয় তেমনি সেই আইনের সঠিক প্রয়োগ ও যথাযথ ব্যবহারসহ এর বাস্তবায়ন নিয়ে মানুষের মনে দেখা দেয় নানা সংশয়। আদতেও আইনের যথাযথ ব্যবহার হবে কিনা কিংবা হলেও পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট খাতে এর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এনিয়ে জণসাধারনের মনে প্রশ্ন দানা বাধে। আবার পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে যখন প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করে কোন আইনের ব্যবহার কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তখন যৌক্তিক ভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাদের ভূমিকা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষন কার্যক্রমের সুচনা হয় ১৯৭৩ সালে পানি দূষন নিয়ন্ত্রন প্রকল্প গ্রহনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে সরকার ১৯৭৭ সালে পরিবেশ দূষণ অধ্যাদেশ জারি করে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রন সেল গঠন করে। এরই ধারাবাহিকতায় পরিবেশ মন্ত্রনালয় গঠন করা সহ ১৯৮৯ সালে গঠন করা হয় পরিবেশ অধিদপ্তর। ৯০ এর দশকের শেষ পর্যন্ত ১৯১ জন জনবল নিয়ে শুধুমাত্র বিভাগীয় পর্যায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রম চালু থাকলেও ধাপে ধাপে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি এর কার্যক্রম দেশের জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারন করা হয়।
কিন্তু পর্যায়ক্রমে পরিবেশ অধিদপ্তরের মানোন্নয়ন করাসহ, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’ এবং পরিবেশ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন সংশোধন ও পরিমার্জনের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ গ্রহন করলেও দেশের পরিবেশগত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তথা পরিবেশ অধিদপ্তর কখনোই প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ঢাকার আশেপাশে ১ হাজারেরও বেশি ইটের ভাটায় প্রতিবছর ইট পোড়ানো হয়। শুধুমাত্র বায়ু দূষণের জন্যই এসকল ইটের ভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী। বর্তমানে হাজার হাজার ইটের ভাটা রয়েছে সারা দেশে, যার একটি বড় অংশই অবৈধ। আবার যেসকল ইটের ভাটার বৈধতা রয়েছে তার অধিকাংশই মানছে না ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রন) আইন। যার কারনে বায়ু দূষণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমি ও পরিবেশগত ভারসাম্য। এদিকে এসকল ইটের ভাটার অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নিতান্তই যৎসামান্য। যদিও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ তাদের শতভাগ সফলতা অর্জন করতে না পারার মূল প্রতিবন্ধকতা হিসাবে অধিদপ্তরের জনবল সংকটকে দায়ী করছেন।
জনবল কাঠামো অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের মোট অনুমোদিত জনবল ৭২০ জন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট জনবলের বিপরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরে কর্মরত জনবলের সংখ্যা ৪৪৮ জন আর শূণ্য পদ আছে ২৭২টি। তবে জনবল সংকট থাকলেও অভিজ্ঞরা বলছেন সরকারের এই দপ্তরের বর্তমান জনবল দিয়েও বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব।
এদিকে পরিবেশ সংরক্ষণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তর হলেও, ইট ভাটা’র ইট পোড়ানোর লাইসেন্স প্রদানসহ লাইসেন্স বাতিল, সংরক্ষণসহ ইট ভাটার মূল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। ইট ভাটার তদারকীসহ তাদের পর্যবেক্ষনের যাবতীয় দায়িত্ব সরকারের এই বিভাগের।
২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইনে সারাদেশের সকল ইট ভাটার লাইসেন্স প্রদানসহ যাবতীয় কার্যক্রম তদারকীর জন্য প্রতিটি জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জেলার একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা বন কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন মনোনীত কর্মকর্তার সমন্ময়ে ‘অনুসন্ধান কমিটি’ নামে একটি কমিটির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কমিটি থাকলেও বাস্তবিক অর্থে এই কমিটিকে অবৈধ কিংবা আইন অমান্য করে পরিচালিত হওয়া কোন ইটের ভাটার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহন করতে দেখা যায়না।
এদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের জেলার অনুসন্ধান কমিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের উপ-পরিচালক মোঃ আব্দুল হাই আওয়ার নিউজ ২৪ ডটকম’কে জানান, “ইট ভাটা সংক্রান্ত ঢাকা জেলার অনুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম বর্তমানে সচল থাকলেও দীর্ঘ প্রায় ১ বছর এই কমিটির কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। দীর্ঘসময় পর মাসখানেক পূর্বে কমিটির কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়।”
অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা ঢাকা জেলার অনুসন্ধান কমিটি পুনরায় চালু হওয়ার কথা বললেও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসাবে ঢাকা জেলা অনুসন্ধান কমিটিতে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহঃ পরিচালক মিহির লাল সরকার আওয়ার নিউজ ২৪ ডটকম’কে বলেন, “জেলা প্রশাসন অবৈধ কিংবা আইন অমান্য করে পরিচালিত হওয়া ইট ভাটার বিরুদ্ধে কোন কার্যক্রম পরিচালনা বা কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে কিনা তা আমার জানা নেই। ঢাকা জেলা অনুসন্ধান কমিটির পক্ষ থেকে সর্বশেষ ২০১৪ সালের শেষে কিংবা ২০১৫ সালের শুরুর দিকের সময়টিতে আমাকে একটি ইট ভাটার বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিলো তবে এর পর এখন অবধি আমি এই কমিটি থেকে আর কোন সাড়া পাইনি।”
ঢাকা জেলার ইট ভাটা অনুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম ও সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ শহিদুজ্জামানের সাথে একাধীকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঢাকার জেলার অন্তর্গত সাভার উপজেলার পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত অবৈধ ও আইন অমান্যকারী ইট ভাটার বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে কিনা তা জানতে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাসেল হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ইট ভাটা সম্পর্কিত বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইট ভাটা কর্তৃক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ অনেক ভুক্তভোগীই মনে করেন সময়ের তুলনায় এখনো অনেকটাই দূর্বল এই আইন। আবার কেউ কেউ বলছেন আইন দূর্বল নয়, দূর্বল আইনটি প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। আর এই দূর্বলতার সুযোগে বছরের পর বছর দেশের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্থ করার পাশাপাশি ইট ভাটা মালিকরা আইন অমান্য করে চলেছে।
এই প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া আওয়ার নিউজ ২৪ ডটকম’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ ইটের ভাটাই উর্বর কৃষিজমিতে অবস্থিত। দেশের হাওর অঞ্চল, নদী পাড়ে যেসকল ইটের ভাটা আছে তার সবইতো উর্বর কৃষিজমি। সরকার এগুলোকে লাইসেন্সও দিচ্ছে, অথচ দেশের ইটভাটা আইন কোন ভাবেই কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন সমর্থন করেনা। সাভার, আশুলিয়া, নারায়নগঞ্জ কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষিজমিতেই ইটভাটা চলছে। এটি কি আইনের দূর্বলতা ? আইনতো করাই আছে। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে উর্বর কৃষিজমিতে কোনভাবেই ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু কিভাবে হচ্ছে ! আইন বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইটভাটার বিষয়ে তাদের সঠিকভাবে পর্যবেক্ষনের জায়গাটিতে দূর্বলতা দেখাচ্ছে। এখানে তাদের উদ্যোগের অভাব, তারা হয়তো যথাযথ উদ্যোগ না নিয়ে কোনভাবে ম্যানেজ করে চলার চেষ্টা করছে। তাদের জনবলের অভাব নেই, যথেষ্ট জনবল রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের, তাছাড়া তাদের আইনও আছে, সাপোর্টও আছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোন কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা পানির লাইন বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের সেই ক্ষমতা আছে। তাহলে ইটের ভাটার ক্ষেত্রে তারা কেন পারছে না ! আমি মনে করি পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে যথেষ্ট পরিমান আইন আছে, এবং তারা যদি তা কার্যকর করে তবে পরিবেশের যথেষ্ট উন্নয়ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
অন্যদিকে ইট ভাটার আইন অমান্য করার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকার ধামরাই উপজেলা ইট ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ নজরুল আওয়ার নিউজ ২৪ ডটকম’কে বলেন,“মালিক সমিতির তালিকা অনুযায়ী ধামরাইয়ে ১৮৫টি ইটের ভাটা আছে। এর মধ্যে সকল ইটের ভাটার যে অনুমোদন আছে তাও না, আবার, সকলের অনুমোদন নাই তাও না। কাদের অনুমোদন নাই কিংবা কারা আইন অমান্য করছে তা দেখার জন্য জেলা প্রশাসন আছে, উপজেলা প্রশাসন আছে, পরিবেশ অধিদপ্তর আছে। আইন অমান্য করার অভিযোগে বিভিন্ন সময় পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন ইটের ভাটাকে জরিমানা করছে, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর জরিমানা করছে। আমার কথায় কোন ভাটা বন্ধও হবেনা, চালুও হবে না সুতরাং কোন অনিয়ম থাকলে তা কর্তৃপক্ষ দেখবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন দুর্বল নয়, হয়তো দুর্বল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতাগণ। তা নাহলে বিদ্যমান আইনেই সারাদেশের ইটের ভাটার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। যার জন্য প্রয়োজন শুধু সংশ্লিষ্টদের যথাযথ দায়িত্ব পালন ও আন্তরিকতা। নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করলে ইট ভাটাগুলো আইন মেনে পরিচালিত হতে বাধ্য বলে তারা মনে করছেন। তাছাড়া অতি শিঘ্রই সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর পরিবেশ রক্ষায় আরও যত্মশীল না হলে আগামী দিনে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও আশংকা করছেন তারা।